শ্রাবণের বাবা নতুন বাড়ি নির্মাণ করিয়েছেন। আজ সকালে সবাই এখানে এসে উঠেছে। রাত ৮টায় শ্রাবণ এলাকাটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। হঠাৎ সে একটি গলি দেখতে পায়। বড় রাস্তা জুড়ে অনেক আলো। তবে ওই গলিটায় শুধু একটি বাতি মিটমিট করে জ্বলছে। গলিটা খুব অদ্ভুত লাগল তার চোখে। সে গলিটার ভেতর ঢোকার সিদ্ধান্ত নিল। ভেতরে ঢুকেই সে চমকে ওঠে! এর ভেতর একটা মানুষও নেই! নেই কোনো শব্দ! একেবারে একটা মৃত শ্মশানপুরী যেন। গলির আরও ভিতরে যেতে কয়েকটি অনুজ্জ্বল বাতি চোখে পড়ল তবে সেগুলো বহু দিনের পুরনো। ছোটবড় বাড়িগুলো সব ভূতুড়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত! নিজেকে প্রশ্ন করল: কেউ কী এখানে থাকে না তাহলে? এটা কী পরিত্যক্ত গলি?

শ্রাবণ সামনের দিকে আরও এগিয়ে গেল আর গলিটার সবকিছু খুঁটে খুঁটে পরখ করতে লাগল। বেশ ভয় ভয় লাগলেও যেতে যেতে সে গলিটার শেষ প্রান্তে গিয়ে চমকে ওঠে! সে দেখতে পেল বিশাল দোতলা একটা পোড়া বাড়ির ছাদে একটি বিড়াল মিউ মিউ করে কাঁদছে। বিভিন্ন উদ্ভিদ আর পরগাছা বাড়িটিকে ঢেকে আছে। ইট-সুড়কির লালচে পাঁজর বেরিয়ে পড়েছে বিকটভাবে। বাড়িটির ছাদের ওপর দেখল এক ঝাঁক বাঁদুড় উড়ছে। সে খুব ভয় পেয়ে গেল। এ ধরনের দৃশ্য যে সহজে চোখে পড়ে না! হঠাৎ তার চোখ আকাশে যেতেই সে আরও ঘাবড়ে যায়। সে দেখল আকাশের চাঁদটা যেন তার মাথার ওপর ঝুলে আছে। মনে হল, বাড়িটির ছাদে উঠলেই যেন সে গোল চাঁদটা ধরতে পারবে। এরপর সে দেখতে পেল এক ভয়ানক দৃশ্য। যা দেখে তার গা শিউরে ওঠে! সে দেখতে পেল বাড়িটির পাশের একটি অচেনা গাছের ওপর চুল এলিয়ে কেউ যেন চুপচাপ বসে আছে। কে এই নারী? সহসা মনে হল, সে যেন ঘাড় ফিরিয়েছে তার দিকে! এসব কিছু দেখে সে আর স্থির থাকতে পারল না দিকবিদিক ভুলে এক দৌড়ে বাসায় ছুটে এলো।

এসেই দেখে আবার অদ্ভুত কাণ্ড! একটু আগে দেখা চাঁদটা আদৌ গোল নয়। তা এখন অর্ধেক দেখাচ্ছে। আশ্চর্য! তখন প্রায় রাত ১০টা। ভাত খেয়ে ঘুমানোর সময়। সেদিন সারারাত তার আর ঘুম হয়নি। এভাবে নতুন এলাকায় শ্রাবণের কিছুদিন কেটে গেল। কিন্তু ঘটনাটি সে ভুলল না। আর ওই গলির দিকেও পা বাড়ালো না। এর মধ্যে তার কিছু বন্ধু জুটে গেল যেমন--অনিক, তপু, মুনির প্রমুখ।

তারা শ্রাবণদের বাড়ির ছাদে একদিন একসঙ্গে বসে কথা বলছিল। শ্রাবণ তাদেরকে ওইদিনের ঘটনাটি খুলে বলল। কিন্তু তারা কেউ তার কথা বিশ্বাস করল না। তপু বলল, তুই যদি আমাদের দেখাতে পারিস তাহলেই আমরা বিশ্বাস করব। মুনির একটু ভিরু গলায় বলল, শুধু শুধু ঝামেলা করার কি দরকার?

শ্রাবণ বলল, ঝামেলা নয়। ব্যাপারটি রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর। আমাদের তা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। আগামীকাল রাতেই আমরা সেখানে যাব, কি বলিস?

সবাই কিশোর। আর বয়সের কারণে সেই ভাবা সেই কাজ। পরের দিন রাতে তারা একজোট হল। সাহস করে গলিটায় ঢুকে পড়ল। ঢুকে তারা অবাক! শ্রাবণের কথার সাথে সবকিছু হুবহু মিলে যাচ্ছে। আশ্চর্য! শেষ পর্যন্ত তারা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালো। প্রধান দরজাটি খোলার চেষ্টা করে অনিক। কিন্তু খুলল না। তারপর চারজন মিলে সমস্ত শক্তি যোগ করে ধাক্কা দিয়ে দরজাটি খুলে ফেলল। দরজাটি খোলার পর একটা ভারী তপ্ত দমকা হাওয়া তাদেরকে ছুঁয়ে বাইরের দিকে চলে গেল। মানুষের গন্ধ পেয়ে বাঁদুড়গুলো সশব্দে ছুটোছুটি শুরু করল। একটা অশরীরী ভয় যেন ক্রমশ তাদের জড়িয়ে ধরতে লাগল। বাড়িটির ভেতর জুড়ে সর্বত্র গাদা গাদা অন্ধকার কুন্ডুলি পাকিয়ে উঠছে বলে তাদের মনে হল।

শ্রাবণ বলল, তোরা কেউ সঙ্গে করে কি ম্যাচ এনেছিস?

তপু বলল, হ্যাঁ। আমি এনেছি।

কিন্তু আগুন জ্বালানোর আগেই একটি আলো এসে সিঁড়ির সামনে পড়ল। অনিক ছিল সবার সামনে আর ওরা একটু পেছনে। যখনই অনিকের পা সেই আলোটিতে পড়ল আর ওমনি সে উধাও হয়ে গেল। তারা চিৎকার করে উঠল এবং দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠল। তারা একটি ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পেল। কিন্তু বাড়িটি এত পুরনো যে ঘড়ি থাকার কথা নয়। তারা একটি ঘর দেখতে পেয়ে তার ভেতর ঢুকল। হঠাৎ শ্রাবণ একটি ছবি দেখতে পেল। ছবিটা খুব অদ্ভুত। ছবিটা দেখে বোঝা যাচ্ছিল একটি মেয়ের ছবি। ছবিটির সবকিছু খুব স্পষ্ট শুধু মুখটি অস্পষ্ট, ঝাপসা। শ্রাবণ বুঝতে পারল যে এই মেয়েটিকে সেদিন রাতে ওই গাছের ডালে দেখেছিল। তপু ছবিটি হাতে নেয়। আর ওমনি বাড়িটিও যেন নড়ে ওঠে!

শ্রাবণ তপুকে বলল, কি অদ্ভুত! ছবিটিকে নাড়ালে বাড়িটিও নড়ে ওঠে। তখনই মুনির চিৎকার করে বলে ওঠে, দ্যাখ্‌ দ্যাখ্‌ সিঁড়িটি ওখানে নেই! তারা দৌড়ে ওই ঘরটি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।

শ্রাবণ হঠাৎ দেখে মুনিরের সামনে ওই আলোটি। শ্রাবণের কিছু বলার আগেই মুনিরের পা পড়ে ওই আলোতে। আর অমনি করে অনিকের মতো সেও উধাও হয়ে যায়! তারা আবার ঘড়ির ঘণ্টা একাধিকবার বাজতে শুনল।

শ্রাবণ তপুকে জোর গলায় বলল, এই তো সিঁড়ি! তখন তারা দেরি না করে নিচে নেমে এলো। শ্রাবণ তপুকে বলল, ছবিটি নাড়ালে যদি বাড়িটি নড়ে ওঠে তাহলে এটিকে পুড়িয়ে ফেললেও তো বাড়িটি পুড়ে যাবে। তাদের মাথায় হঠাৎ এই বুদ্ধিটা খেলল।

তপু বলল, নিশ্চয়ই এই ছবিটির সাথে বাড়ি বা মেয়েটির কোনো সম্পর্ক আছে। তখনই শ্রাবণের চোখে চক্‌চকে কিছু পড়ে। শ্রাবণ হাতে নিয়ে দেখে একটি ঘড়ি তাতে অনিক ও মুনিরের ছবি। আশ্চর্য! সে ছবি দুটি বের করে আর অমনি অনিক ও মুনির তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। মুনির ভয়ার্ত কন্ঠে বলে, আর একটু হলেই ওই ঝাপসা মুখের মেয়েটি আমাদের মেরে ফেলত! বাঁচিয়েছিস।

হঠাৎ তারা গড়্‌র একটা শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকায়। তারা দেখে মেয়েটি তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। মেয়েটি দেখতে ভয়ানক! হাতে তার একটি ছুরি। মেয়েটির মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। আর অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাদের দিকে ছুটে আসছে। তারা তখন কিছু বুঝতে না পেরে থমকে দাঁড়ায়।

শ্রাবণ তখন তার বুদ্ধিটা ঠিকভাবে কাজে লাগায়। সে তপুর কাছ থেকে ছবিটা নিয়ে প্রথমে ডানে ও পরে বামে কাত করে। আর মেয়েটিও ডানে ও বামে হেলে পড়ে। তপুও তখন আর দেরি না করে ম্যাচ থেকে আগুন ধরিয়ে দেয় ছবিটিতে। আর মেয়েটিও অমনি পুড়ে ছাই হয়ে যেতে থাকে দ্রুত নিঃশব্দে।

তারপর চারজন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বড় একটা বিপদ থেকে বেঁচে গেল তারা। কিন্তু এমন অলৌকিক ঘটনাও কি ঘটে পৃথিবীতে, তাদের প্রত্যেকের মনেই সে প্রশ্নটা কেবলি খচ খচ করতে লাগল তবে কেউ কাউকে কিছু বলল না।

 

শ্রেণী: ৮ম, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা





Powerd by Manchitro Publishers, 2011 Copyright © All Rights Reserved.


কুমিল্লা বাংলাদেশের একটি প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ জেলা। কুমিল্লা শহর বিখ্যাত গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত। রাজধানী থাকা থেকে ১০০ কিমি দূরে অবস্থিত এই জেলারই উপজেলা দাউদকান্দির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে আরেকটি বিখ্যাত নদী মেঘনা। ১৭ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাটের অধীনে ছিল কুমিল্লা। কিন্তু তারও আগে কুমিল্লা শহর হিসেবে গড়ে উঠেছিল বলে মনে হয়। শহরের অদূরে রয়েছে বিখ্যাত বৌদ্ধ প্রত্ননিদর্শনসমৃদ্ধ লালমাই পাহাড়-সংলগ্ন ময়নামতি নগর। হাজার বছরের অধিক প্রাচীন ময়নামতি নগরে আবিষ্কৃত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমানবন্দর স্থাপনের জন্য মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে অনেকগুলো বিহার ও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। মাটির নিচে চাপাপড়া প্রায় ৫০টি বিহারের মধ্যে মাত্র গোটা কয়েকটি খনন করে উপরে তোলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে শালবনবিহার, কুটিলামুড়া, আনন্দবিহার, ছড়াপত্রমুড়া, ইটখোলামুড়া, রূপবানমুড়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মনে করা যায় রাজশাহীর পাহাড়পুরের সোমপুর বিহারের আদলে তৈরি ময়নামতি পুরাসম্পদটির আকার ও গঠনশৈলীর মধ্যে অনেকাংশে মিল বর্তমান। এবং দুটোই বিশাল জায়গা নিয়ে গঠিত।

ময়নামতি বাক্যবন্ধটি মূলত এই জায়গার নামকরণে ব্যবহত হয়েছে একদা প্রচলিত লোকশ্রুতি অনুযায়ী। ময়নামতির গান এখনো শোনা যায় প্রবীণ মানুষের মুখে। পুঁথিও আছে বৈকি। প্রাচীন দেববংশ, খড়গবংশ ইত্যাদি রাজবংশের শাসনের কথা ময়নামতি আখ্যানের সঙ্গে জড়িত আছে। মনে করা হয়, কোন এক রাজার রাণী ছিলেন এই ময়নমতি আবার অদুনা ও পদুনা নামের রানীদের নামও শোনা যায়। একসময় এই বৌদ্ধবিহারকে কেন্দ্র করে তান্ত্রিক বৌদ্ধশাখার কাহ্নুপা, হারিপা, সিদ্ধাপা সন্ন্যাসী সম্পদ্রায়ের আবাস ছিল বলে কোন কোন গবেষক মনে করেন। এদের অনেক গুরু ও শিষ্যরা উলঙ্গ এবং গাছগাছালির উপর জীবনযাপন করতেন বলে জনশ্রুতি  আছে। তান্ত্রিকধর্ম মূলত হিন্দুধর্ম থেকে এসে বৌদ্ধধর্মকেও প্রভাবিত করেছিল। কাজেই এই তন্ত্রমন্ত্র বিষয়টিই রহস্যময়। শুধু তান্দ্রিক বৌদ্ধসম্প্রদায়ের লোকজনই ময়নামতিতে বাস করতেন তা নয়,তান্ত্রিকতায় প্রভাবিত হয়ে থাকবেন হিন্দু রাজরাজড়াও।

ময়নামতি বৌদ্ধবিহারের উপর দাঁড়িয়ে অনেকবার আমি কল্পনা করেছি কী রকম হতে পারে সেই প্রাচীন আমলের তান্ত্রিক পূজো-অর্চনা। ক্ষয়ে-ক্ষয়ে যাওয়া ঝুরঝুরে পোড়ামাটির ভগ্ন ইমারতগুলো অদ্ভুত এক রহস্যের অদৃশ্য জাল বিছিয়ে রেখেছে যেন সমগ্র অঞ্চলটি জুড়ে। কল্পনায় যেন ধরা এমন একটি দৃশ্য: আজও অমাবশ্যার তিথিতে সন্ধ্যে হলেই অন্ধকার ভেঙ্গে যেন সারিবদ্ধ তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর দল দূর কোন অজ্ঞাতবাস থেকে হেঁটে হেঁটে এসে জড়ো হন এই বিহারের ভগ্ন আলো-আঁধারির আবছায়াঘন কুঠুরিগুলোতে। অনুজ্জ্বল প্রদীপের আলোয় মুন্ডিতমস্তক লালরঙা এক কাপড়ে প্যাঁচানো পেশীবহুল মানুষগুলো ধূপধুনো জ্বালিয়ে ধোঁয়ার কুন্ডুলির মধ্যে ঘুরে ঘুরে মন্ত্র জপ করতে থাকেন। কুঠুরির দেয়ালের খোপে কালো এক প্রতিমা সম্ভবত কালীদেবী হবেন। সুনসান মাঝরাতে বিহারের নিচে কোথায় যেন শিকলের ঝনঝন শব্দ হচ্ছে, মানুষের গোঙানি, সমস্বরে সুরেলা মন্ত্রপাঠের ধ্বনি ঢেউয়ের মতো উঠানামা করছে। তারপর.....তারপর.....চাপা এক আর্তস্বর! না, মানুষের নয়--মনে হয় কোন পশুর। তাহলে কী পশুবলি হচ্ছে আজও এই একুশ শতকের যুগে? নরবলিও তো হতে পারে! সেই যে ছেলেবেলায় পড়েছি একাধিক রহস্যগল্প, উপন্যাসে তান্ত্রিকদের নরবলিযজ্ঞের কথা আজও সত্যি কি মিথ্যে জানি না, এত বছর পরও সেই বালক বয়সে ভাবিত মনোলোকের দৃশ্যাবলি কখনো কখনো অবচেতন সময়ে নাড়া দেয় বৈকি! 

এ তো আমার কল্পনার জগতের রহস্যপুরী ময়নামতির কথা বললাম। এই কুমিল্লা শহরে রয়েছে বাংলাদেশের সম্ভবত উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় দিঘি ধর্মসাগর। এটি কমপক্ষে ৫০০ বছর প্রাচীন। ত্রিপুরার রাজা ধর্মমাণিক্য এটি খনন করেছিলেন বলে ইতিহাসে আছে। পানযোগ্য জলসঙ্কট নিরসনে প্রজাহৈতেষী রাজা এই দিঘি খনন করলেও এই নিয়ে নানা শ্রুতিমধুর গল্প আমরা ছেলেবেলায় শুনেছি। বিশাল এবং সুগভীর এই দিঘির মাঝখানে নাকি তালগাছ ছিল কয়েকশ বছর। তালগাছের মাথা কিছুটা জলের উপর ভেসে থাকত। আগের দিনে সাধারণত এত বিশাল দিঘিতে মানুষ স্নান বা সাঁতার করা থেকে বিরত থাকত নানা রকম লোকভয়ে। নদীমাতৃক বাংলা অঞ্চল দেও-দানব, জলদেবদেবী, জলরাক্ষস ইত্যাদি অলৌকিক অপশক্তির রাজ্য ছিল অতীতকালে এমন ধারণা আমার আশৈশব। কত রকম কুসংস্কার বা গুজব যে এখনো গ্রামীণ অঞ্চলে আছে সে তো আমরা মোটামুটি জানি। এই ধর্মসাগর নিয়েও হয়তবা তাই। ঐ তালগাছটির কালো দণ্ডসদৃশ মুন্ডটি সাঁতরে গিয়ে দুঃসাহসী কারো কারো স্পর্শ করার অভিজ্ঞতার কথাও শুনেছি। ফলে অনেকের দৃঢ়মূল বিশ্বাস ছিল যে, এটা আসলে দিঘি ছিল না, এটা ছিল শক্তিদেবদেবী পূজারী শাক্তরাজবংশের একটি উপাসনাস্থল। বছরে একবার বা একাধিকবার এখানে ধর্মীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হত ঘটা করে। ঐ তালগাছ নাকি কোন এক কল্পতরু তার পাদতলে স্বয়ং রাজা-রানী-সভাদরা পুরেহিতদের সঙ্গে বসতেন। পূজো, আরাধনা অনুষ্ঠিত হত। দূরদূরান্ত থেকে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা, রাজার ভক্তরা এখানে এসে জড়ো হতেন রাজার আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য। আবার যাঁরা ছিলেন ধনী,জায়গীরদার বা সঙ্গতিসম্পন্ন তাঁরা উপঢৌকন নিয়ে আসতেন যেমনটি প্রাচীনকাল থেকেই রাজরাজড়ার ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। এই সম্মেলন উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ খাওয়াদাওয়া,নাচগানের উৎসব এবং লোকজ পণ্যসামগ্রীর মেলাও যে বসত তা বলাই বাহুল্য। তবে কত বছর পর্যন্ত এই রীতি বলবৎ ছিল সে সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক তথ্য নেই বা কুমিল্লার ইতিহাস নিয়ে রচিত বিখ্যাত রাজমালা গ্রন্থেও উল্লেখ নেই।

এবং কবে থেকে এই জনশ্রুতির সূচনা তাও অজানা। কথায় বলে কল্পনাশক্তির কোন দেশ-বিদেশ বা সীমা-পরিসীমা নেই। আবার এটাও ফেলে দেয়া যায় না যে, কল্পকাহিনী, জনশ্রুতি  বা গুজবের সঙ্গে সত্যের সংযোগ আছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, অর্ধেক সত্য আছে বলেই সেটা গুজব। ধর্মসাগর দিঘির পূর্বপাড়ে রয়েছে কালীদেবীর মন্দির। কথিত আছে যে,ভারতবিভাগের পূর্বেই এই কালীবাড়ির জনৈক বধূ স্বপ্নে দেখেছিলেন তাঁর বাড়ির ঘাট থেকে খানিকটা দূরে জলের তলে কালীদেবীর একটি ধাতব মূর্তি আছে। দেবী জলবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে চান। তারপর বাড়ির লোকজন সেই মূর্তি অনেক খুঁজে-খুঁড়ে তুলে এনে বাড়ির নবমন্দিরে অধিষ্ঠিত করেন। আজও প্রতি বছর এখানে ধর্মীয় উৎসব,গানবাজনা অনুষ্ঠিত হয়। রাধাকৃষ্ণের দোল উৎসব উপভোগ করেছি মার সঙ্গে গিয়ে আমরা ভাইবোন অনেকবার। সেইসব স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল। তাহলে কী ধরে নেব যে, সত্যিই এখানে একদিন ধর্মীয় উৎসব হত? কোন এক মৃৎশিল্পী দেবদেবীর মূর্তি বিক্রি করার সময় ফেলে রেখে গিয়েছিলেন আগত অগণিত মানুষের পরিত্যক্ত আবর্জনার তলে। অথবা কেউ মূর্তি কিনে কোন কারণে ভুলে সেটা ফেলে গেছেন। তারপর সেই মূর্তি ক্রমে ক্রমে মাটির তলে তলিয়ে গেছে?

লোকধারণা একসময় ত্রিপুরাবাসীর চরম জলসঙ্কটের কারণে এই উপাসনাকেন্দ্রের মূলবেদীর চর্তুদিক গভীরভাবে খনন করে জলাশয়ের সৃষ্টি করা হয়। তারপর ক্রমান্বয়ে ঝড়জলবৃষ্টিবন্যার ফলে বিশালাকার ধারণ করে। আমার বয়োসন্ধিকাল কাটিয়েছি এই দিঘির পশ্চিম পাড়ে। এর উত্তর পাড়ে রয়েছে চমৎকার একটি উদ্যান, ত্রিপুরার রানীর কুঠিবাড়ি। তার একটি অংশে কবি নজরুল সঙ্গীতবিদ্যালয়। পূর্ব পাড়ে জলের ট্যাঙ্ক, জেলা জনস্বাস্থ্য অফিস, কালীবাড়ি, স্টেডিয়াম এবং জেলা স্কুল। দক্ষিণ পাড়ে শিশুমঙ্গল হাসপাতাল, খ্রিস্টান পাড়া, ব্যাপ্টিস্ট মিশন ও গীর্জা এবং পশ্চিম পাড়ে বাড়িঘর। যেমন জনৈক ইঞ্জিনিয়ারের বাড়ি, সড়ক ও জনপথ দপ্তরের প্রধান ইঞ্জিনিয়ারদের বাসভবন, আয়কর উকিল, কারাপরিদর্শকের বাসভবন ইত্যাদি। কুমিল্লা শহরে দেখার ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো একটি স্বাস্থ্যকর স্থান এই ধর্মসাগর দিঘি। দিঘির পশ্চিম পাড়টি ইটের দেয়াল দিয়ে বাঁধানো বলে আমরা দিনরাত এখানেই আড্ডা দিতাম। এক সময় দক্ষিণ পাড়ে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে ভোরবেলা আমরা তরুণ লিখিয়েরা ছড়া/কবিতা পাঠের আসর জমাতাম। কোন-কোনদিন আমরা এই দিঘির রহস্য নিয়েও মাতামাতি করেছি,ঝগড়া করেছি। গভীর রহস্যময় এর ঘনঘাসরঙা জলের পাতালদৃশ্য নিয়ে কম কল্পনা করিনি আমরা।

২০০৮ সালে অগ্রজ কবিবন্ধু বিজন দাস তথা বিজনদার কাছে শুনলাম শত বছরের ব্যবধানে মাত্র একবারই স্বাধীনতার পরপর এই দিঘির সমস্ত জল সেচে ফেলা হয়েছিল। তিনি তখন কিশোর। স্মৃতিচারণ করে  বললেন, কত বড় বড় মাছ যে ধরা পড়েছে তার হিসেব নেই। ট্রাক বোঝাই করে মাছ নিয়ে গেছে মৎস্য দপ্তর। হাঁটুসমান লোধমাটিতে কতকিছু যে পাওয়া গেছে তার ইয়ত্তা নেই! ধাতব হাঁড়ি-বাসন, অস্ত্রশস্ত্র, ধাবতমুদ্রা, মহিলাদের অলঙ্কার, মানুষের হাড়গোড়ও ছিল। সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ মেরে এখানে ফেলে দেয়া হয়েছিল। তখন তাঁকে একটি কথা জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি জানেন যে পাকিস্তান হওয়ার পরপরই দিঘির পূর্ব-দক্ষিণ কোণে এখন যেখানে জিলা স্কুল তার ঘাটে এক ধোপা প্রতিদিন কাপড় ধোয়া-পাকলার কাজ করতেন। একদিন তাঁর লাশ পাওয়া গিয়েছিল বহু দূরে দাউদকান্দির কাছে মেঘনা নদীতে?

বিজনদা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, আরে আপনি এ খবর জানলেন কি করে!

আমি তখন বললাম, ছেলেবেলায় বাবার মুখে শুনেছি। আপনি জানেন ভালো করে বাবা সদর পুলিশকোর্টের অফিসার ছিলেন। বাবা একবার বেড়াতে নিয়ে এসেছিলেন মাছধরার উৎসবের সময় দিঘির পাড়ে। তখন বেঞ্চিতে বসে বাবা বলেছিলেন,ঐ যে জিলা স্কুল দেখতে পাচ্ছে ওখানকার ঘাটে রজবনামে মধ্যবয়সী এক ধোপা আর তাঁর স্ত্রী কাপড় ধোয়া-পাকলা করতেন। ধোপা ধুয়ে দিতেন আর ধোপিনী দিঘির পাড়েই দড়িতে মেলে দিতেন। একবার একদিন দুপুরবেলা ধোপিনীর চিৎকারে, কান্নার শব্দ শুনে স্কুলের শিক্ষকরা এসে জড়ো হলেন। ধোপারা তো এদেশে এসেছে মূলত ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে। বাংলা খুব ভালো জানে না। ধোপিনী মাথায় হাত দিয়ে কেঁদেকেঁদে উর্দুতে বলছিলেন: তার স্বামীকে জলেদেওতা মানে জলদেবতা টেনে নিয়ে গেছে। সে তো আর উঠে আসছে না! তোমরা খোঁজ করো, পুলিশে জানাও। তাজ্জব ব্যাপার! এমন ঘটনা কখনো শোনা যায়নি। রজব খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কারো সঙ্গে ঝগড়া-ঝাঁটি ছিল না। বাদুরতলার সবাই ওদেরকে যত্নআত্তি করত। পুলিশের পোশাকও এখানকার কয়েক ঘর ধোপারা ধোয়া-পাকলা এবং ইস্ত্রি করে দিত। রজবের নিরুদ্দেশ হওয়ার দুঃসংবাদ জিলা স্কুলের শিক্ষক হয়ে থানায় পৌঁছুল। জেলা প্রশাসকের আদেশে তৎক্ষনাৎ অনুসন্ধানী টিম নামানো হল শহরে। কয়েকটি বোট নামিয়ে লম্বা লম্বা বাঁশ দিয়ে গুঁতিয়ে খোঁজ করা হল। ডুবুরি নামানো হল। এভাবে কয়েকদিন গেল তাঁর কোন খোঁজ পাওয়া গেল না, লাশও ভেসে উঠল না। পুলিশ দিঘি জুড়ে টহল দিচ্ছে প্রতিদিনই।

এদিকে এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পরে একদিন সকাল বেলা একটি ছিন্নভিন্ন লাশ জলের উপর ভাসতে দেখে নৌকোয় তুলে এক জেলে সোজা থানায় নিয়ে এলো। লাশ ফুলে গিয়ে কদাকার ধারণ করেছে। চেনার উপায় নেই। খাকি প্যান্ট-শার্ট ছেঁড়া, রক্তাক্ত। সারা শরীরে বহু দীর্ঘ দীর্ঘ আঁচড়ের দাগ। মনে হয় দেহটিকে টেনে-হিঁচড়ে একাকার করা হয়েছে এরকম চিহ্ন। শনাক্ত করার উপায় নেই মুখমন্ডল। স্থানীয় কারো লাশ কিনা খোঁজখবর নিল পুলিশ।না,স্থানীয় কোন গ্রামাঞ্চলে এই পোশাক পরা লোকজন নেই। তারপর দাউদকান্দি থেকে লাশটি কুমিল্লার সদর কোতোয়ালি থানায় আনা হল। থানার ওসি পোশাক দেখেই শনাক্ত করেন এটা রজবের লাশ। কিন্তু বিস্ময়ে থ হয়ে গেলেন ধর্মসাগর থেকে অত দূরে মেঘনা নদীতে ভেসে উঠল কেন! আরও বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন রজবের ডান পায়ে মোটা ও শক্ত দড়ি বাঁধা!খবর পেয়ে ধোপিনী এলেন। হাউমাউ কাঁদলেন। তখন ওসি জিজ্ঞেস করলেন, এই দড়ি কি রজবভাই সমসময় পায়ে বেঁধে রাখতেন? ধোপিনী বললেন, ঐ দড়ি ধরেই তো জলদেওতাতার স্বামীকে অনেকক্ষণ টানাটানি করে জলের তলে নিয়ে গেল! আর ভেসে উঠল না! ওসি সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন, দড়ি বাঁধতেন কেন? ধোপিনী জবাব দিলেন, মাছের জন্য গো মাছের জন্য! এই দিঘিতে বহু বড়া-বড়া মাছআছে আমার স্বামী দেখেছিল। জানা গেল, কাপর ধোয়ার পাশাপাশি তার স্বামী দড়িতে বড়শি বেঁধে মাছও ধরতেন। ঐ দড়ি ডান পায়ে বাঁধা থাকত। মাছ যখন আধার খেয়ে আটকে যেত তখন টান পড়ত তারপর টেনে তীরে তুলে আনতেন মাছ। অনেক ছোট-বড় মাছ সে ধরেছে। নিজেরা খেয়েছে আবার বাজারে বিক্রিও করেছে।

এবার চেয়ারসুদ্ধ ওসি সাহেব হুমড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা! চোখ কপালে তুলে বললেন, তাহলে বড় কোন মাছ তাঁকে টেনে নিয়ে গেল! একি সম্ভব? তারপর এক সপ্তাহ পর তাঁর মৃতদেহ ভেসে কমপক্ষে ৪০ মাইল দূরে মেঘনা নদীতে! কিভাবে? কিভাবে? ধর্মসাগর দিঘির তলদেশ থেকে কোন সুড়ঙ্গ চলে গ্যাছে মেঘনা নদী পর্যন্ত!? এটাও কী বা¯Íববাদী পুলিশকে বিশ্বাস করতে হবে? এটা কী রূপকথা? রহস্যের গল্প পড়ে আমারও কী মাথা খারাপ হয়ে গেল?

আসলে তাই-ই ঘটেছিল। এই ঘটনা তখনকার সংবাদপত্রে ফলাও করে ছাপা হয়েছিল বলেও বাবা বলেছিলেন।

বিজনদা বললেন, আমিও এই ঘটনার কথা শুনেছি। আসলে তখন এমন একটা সময় ভাষা আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, পাক-ভারত যুদ্ধ ইত্যাদির কারণে তেমন আলোড়ন তোলেনি, চাপা পড়ে গেছে। অনেকে মিথ্যে বলেও উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে, যদি ঘটনা সত্যি হয়ে থাকে তাহলে স্বীকার করতে হবে যে একটা সুড়ঙ্গ বা যোগাযোগ পথ ধর্মসাগর দিঘি থেকে মেঘনা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত আছে যা আমরা জানি না, অনুসন্ধানও করিনি। 

এই ঘটনা বাবার মুখে শোনার পর ৩৫/৪০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আজও যখন ধর্মসাগর দিঘির কাছে যাই পূর্ব-দক্ষিণ কোণের দিকে তাকাই একটি দৃশ্য যেন চোখে পড়ে: হুড় হুড় করে নেমে যাচ্ছে একটা মানুষ হাতে তার দড়ি ধরা! 



Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.



রবিবার। কাজের তাড়া নেই। খান চারেক বিস্কুট আর দু’কাপ কাকো খেয়ে গোবিন্দ আরামে খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছে। এমন সময় রবীন এসে পড়লো। সামনের চেয়ারখানি দখল করে বললো--কাগজে পড়লাম, ওকালিতির সঙ্গে গোয়েন্দাগিরি চালাচ্ছো, তা বেশ।

চায়ের পর্ব শেষ করে রবীন আসল কথায় এলো। বললো--তোমার কাছে এলাম, তুমি আমায় কিছু সাহায্য করো দেকি। এই দেখোঃ

একখানা চিঠি সে এগিয়ে দিলে গোবিন্দর সামনে।

নীল খামে, নীল কাগজে সৌখীন করে গোটা গোটা অক্ষরেলেখা 

     মহারাজের সেক্রেটারী মহোদয় সমীপে--

     মান্যবর মহাশয়,

কাল সন্ধ্যায় মহারাজ দিল্লী গিয়াছেন। সামন্ত রাজ্য অধিকার করার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার এ পর্যন্ত মহারাজকে যে বার্ষিক বৃত্তি দিয়া আসিতেছেন, মহারাজ তাহাতে সন্তুষ্ট নন। তিনি সেই বৃত্তি বাড়াইবার জন্য প্রথমাবধি তদ্বির করিয়া আসিতেছেন। এবারও এজন্য দিল্লীতে কয়েকদিন তাঁহাকে থাকিতে হইবে। এই কয়দিন আপনিই মহারাজের কলিকাতার বাড়িতে একা থাকিবেন। সেখানে যথেষ্ট অরঙ্কার ও হীরা-জহরত আছে। সম্প্রতিসেইগুলির উপর একদল দস্যুর নজর পড়িয়াছে। সেগুলি হস্তগত কবিরার জন্য তাহারা উৎসুক। আপনি সাবধান হইবেন। শুভাকাঙী হিসাবে আপনাকে সতর্ক করিয়া দিলাম। ইতি--

অতিপরিচিত এক বন্ধু

(বিপদ ঘটিবার ভয়ে নাম প্রকাশ করিলাম না)

রবীন বললো-- এই চিঠি পেয়েছি কাল সন্ধ্যায়। পরশু সকালে মহারাজ দিল্লী গেছেন। আমি একা আছি রাজবাড়িতে, সত্যি সেখানে লাখ টাকার হীরে-জহরৎ আছে। এখন আমার করণীয় কি বলো তো?

--বাড়িতে চাকর-দারোয়ান আছে, বন্দুকও তো আছে।

--চাকরদের উপর ভরসা রাখা যায় না। তাছাড়া সবচেয়ে পুরানো চাকরটা ছাড়া অন্য তিনজন দিন-তিনেকের জন্য গঙ্গাসাগরে গেছে পুণ্যি করার জন্য। আর দায়োরয়ান ও তার বন্দুক। দুটোই পোশাকী। দারোয়ান বোধহয় সারা জীবনে তার বন্দুকটা ছোঁড়েনি, ছুঁড়তে জানে কি না, তাই বা কে জানে।

--তাহলে পুলিশে খবর দাও।

--না, পুলিশে খবর দেয়া চলবে না। রাজ্য দখল করার সময় মহারাজের হীরে-জহরতের একটা হিসাব দাখিল করতে হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। মহারাজ অনেক গোপন করেছিলেন। পাগড়িতে পরার জন্য পাঁচখানা বড় বড় হীরে বসানো একটা ‘ডায়মন্ডপিন’ আছে, সেটার মূল্যই অন্তত দশ লাখ টাকা, হিসাবে তার কোন উল্লেখই নেই। এমনি আরো কত আছে, পুলিশ তো সে কথা জানবে। তখন আবার আরেক দিকে মুশকিল দেখা দেবে।

--সেগুলো আছে কোথায়?

--বাড়িতে।

--কেন? ব্যাঙ্কের সেফ্ ডিপজিট্ ভলটে রাখেনি কেন?

--সেদিকে মহারাজের আবার ভয় আছে, যদি কোন গভর্নমেন্ট ভল্ট্ ‘লক’ করে দেয়। সোনা যেভাবে কন্ট্রোল করলো, তাতে সেই ভয় এখন আরো বেড়েছে। এখন আমি পড়েছি বিপদে। এখানে এখন আমার জিম্মায় সব। আবার তার উপর এই চিঠি। তাই তোমার কাছে ছুটে এলাম। তুমি একবার চলো। তুমি দেখে শুনে যা বলবে, আমি সেইমতো ব্যবস্থা করবো।

চিঠিখানা হাতে নিয়ে গোবিন্দ ক’মিনিট চুপ করে রইল, তারপর বললো--আমার আজ জরুরী একটা কেস আছে। সন্ধ্যেবেলা কোর্ট থেকে ফিরে এসে জামাকাপড় বদলে রাত আটটা-ন’টা নাগাদ তোমার ওখানে যাবো। তুমি থেকো।

--আমি সারাদিনই আছি। বাড়ি পাহারা দিচ্ছি। রাতেও জেগে থাকি, ভয়ে ঘুম হয় না। তুমি রাত বারোটায় গেলেও দেখবে আমার ঘরে আলো জ্বলছে।

রাত ন’টা।

কলকাতার হঠাৎ বড়লোকী পাড়া নিউ আলিপুরের একখানি সুদৃশ্য দোতলা বাড়ির সামনে এসে গোবিন্দ দাঁড়ালো। সামনে ছোট পাঁচিল। একটি ছোট ফটক পার হয়ে দুসারি ফুলের গাছ। তার পরেই বারান্দা। দোতলায় আলো জ্বলছে, নীচেটা আগাগোড়া অন্ধকার। দরজা খোলাই ছিল, তবু গোবিন্দ কলিং বেল টিপলো।

কিন্তু বার তিনেক টিপেও কোন সাড়া পাওয়া গেল না।

গোবিন্দ ডাকলো--রবীন, রবীনবাবু!

কোনা সাড়া নেই। গোবিন্দর কি যেন মনে হলো। ঢুকে পড়লো বাড়ির মধ্যে। অন্ধকারে বরাবর দোতলায় উঠে যাবে নাকি? দরকার নেই। ডাইনের ঘরে পর্দা ঝুলছিল। সেই ঘরে গিয়ে ঢুকলো। আলোটা জ্বেলে এইখানেই একটু বসা যাক। দরজার আশেপাশে আলোর সুইচ্টার জন্য সে হাত বাড়ালো। সুইচ মিললো। আলো জ্বলতেই গোবিন্দ চমকে উঠলো।

সামনেই টেবিল। টেবিলের ওপাশে একখানি সোফায় রবীন ঢলে পড়েছে, জামার উপর দিয়ে রক্তের স্রোত নেমে এসেছে মেঝের উপর।

মরে গেছে। খুন! গোবিন্দ এগিয়ে গায়ে হাত দিয়ে তবু একবার দেখে নিলে। ছুরি মেরে রবীনকে হত্যা করা হয়েছে। জহরতের জন্যই রবীন খুন হয়েছে। এখনি পুলিশে খবর দেওয়া দরকার। মহারাজের মুকুটের হীরে রাখতে গিয়ে গরীব এম এ পাশ করা সেক্রেটারী প্রাণ হারালো।

ঘরে কোথাও জোর-জবরদস্তির চিহ্ন নেই। কোন চীৎকার কি আর্তনাদ শোনা গেলে আশেপাশের বাড়ির মানুষ নিশ্চয়ই কৌতূহলী হতো। বাড়ির অন্য লোকও জানতো। কিন্তু বাড়ির অন্য লোক কি আছে? তাহলে ডাকলে সাড়া পাওয়া গেল না কেন? দারোয়ানই বা গেল কোথায়? খুনী রবীনের খুবই পরিচিত মনে হয়। তার কাছ থেকে আক্রমণ রবীন বোধহয় আশাই করেনি। তাই বিনা বাধায় ঘটেছে ব্যাপারটা। গোবিন্দ ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বরাবর ভিতরে চলে গেল। নীচের অন্ধকার ঘরগুলি পার হয়েই সিঁড়ি। সিঁড়ি থেকে উপর অবধি সব ঘরেই আলো জ্বলছে। নীল পর্দা ঝুলছে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রাণী নেই ঠাকুর-চাকর গেল কোথায়? ছিমছাম সাজানো সব ঘর। কোন ঘরে চোর-ডাকাতের লন্ডভন্ড করে খোঁজাখুঁজির চিহ্ন নেই।

গোবিন্দ নীচে গেলো। অন্ধকার ঘরগুলির ভিতরে ঢুকে একে একে আলো জ্বাললো। ভাঁড়ার ঘরে রেফ্রিজারেটারটা শুধু খোলা রয়েছে, আর কোন ঘরে কোথায় এতটুকু বিশৃঙ্খলা নেই। কিন্তু দারোয়ান কোথায়? তার ঘর অন্ধকার। অনেক চেষ্টার পর সুইচ পাওয়া গেল। আলো জ্বালতেই গোবিন্দ আবার চমকে ওঠে। মেঝেয় মাদুরের ওপর দারোয়ান চিৎ হয়ে পড়ে আছে। অজ্ঞান। অদূরে একটা এনামেলের গ্লাস। কোন পানীয় ছিল মনে হয়।

সব দেখেশুনে গোবিন্দ ফিরে এলো বৈঠকখানায়। কোন কিছু সে স্পর্শ করলো না। টেলিফোনের রিসিভারটা রুমাল জড়িয়ে তুলে নিল, ডায়াল করলো লালবাজার। এখানে একটা খুন হয়েছে, মহারাজার সেক্রেটারী রবীন মিত্র খুন হয়েছে। দারোয়ান তার ঘরে আজ অজ্ঞান হয়ে আছে। বাড়িতে আর কেউ নেই। নিউ আলিপুর, ব্লক জেড....নং বাড়ি।

ওপাশে জমাট মেঘ। গোবিন্দ স্থানত্যাগ করলো। চেপে বৃষ্টি এলো একটু পরেই।

একদিন পরে খবরের কাগজে বেরুলো

‘নিউ আলিপুরে দেবগড়ের মহারাজার সেক্রেটারী রবীন মিত্র খুন হইয়াছেন। বাড়িতে দারোয়ান ছাড়া আর কেহ ছিল না, বিষাক্ত জল পান করায় সে অজ্ঞান হইয়াছিল। সেই অবকাশে আততায়ী সন্ধ্যার খানিক পরেই রবীনবাবুকে হত্যা করিয়া সরিয়া পড়ে। পুলিশ গৃহভৃত্যকে গ্রেপ্তার করিয়াছে। সে সিনেমার টিকিট দেখাইয়াছে, সন্ধ্যায় সে সিনেমা দেখিতে গিয়াছিল। কিন্তু পুলিশ তাহার জামার হাতায়, খুব সামান্য হইলেও রক্তের দাগ পাইয়াছে। মহারাজার গৃহে কিছু মূল্যবান হীরা-জহরত ছিল। সে সব কতটা লুঠ হইয়াছে তাহা এখনও জানা যায় নাই।

মহারাজ দিল্লী গিয়াছেন, তিনি ফিরিয়া না আসা পর্যন্ত সঠিকভাবে কিছুই জানা যাইতেছে না। তবে ভৃত্য বলিতেছে, সে খুবই বিশ্বাসী, গত পনেরো বছর ধরিয়া সে ওই গৃহে কাজ করিতেছে। পুলিশ রহস্যভেদের চেষ্টা করিতেছে।’

দু’দিন পরে করোনারের আদালতে পুলিশ জানালো, গৃহভৃত্যের জামায় রক্তের যে দাগ দেখা গেছে, সে রক্ত ও নিহত রবীন মিত্রের রক্ত অভিন্ন।

মহারাজ কিন্তু বললেন,--এই ভৃত্য জগারাম তার কাছে পনেরো বছর চাকরি করছে, কোন দিন তাকে অবিশ্বাস করার কোন কারণ ঘটেনি, এর পিতাও তাঁর কাছে ভৃত্যের কাজ করে গেছে। এরা তাঁর প্রজা।

ভৃত্য জগারাম সিনেমার টিকিট দেখিয়ে আদালতে কান্নাকাটি শুরু করে। সে বলে, রক্তের দাগের কথা সে জানে না, সে ছুটি নিয়ে সিনেমায় গিয়েছিল। কিন্তু একটা হত্যাকান্ডের ব্যাপারে এতো সহজে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। পুলিশ জগারামকে হাজতে পুরলো, এবং  সাক্ষ্য-প্রমাণের জন্য সচেষ্ট হলো।

এদিকে অনেক কষ্টে দারোয়ানের প্রাণ রক্ষাপেল। কিন্তু পানীয় জল কীভাবে বিষাক্ত হলো, সে বলতে পারলো না।

তারপর মাস খানেক কেটে গেল, কিন্তু পুলিশ কোন সূত্র খুঁজে পেল না।

গোবিন্দ আসামী পরে উকিল হয়ে দাঁড়ালো। ফী না নিয়েই সে মামলায় নামলো। বললো--রবীন আমার সহপাঠী ও বন্ধু ছিল। তার আসল হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে। একটা নিরীহ চাকরকে জেলে পাঠিয়ে আসল আসামী সন্দেহের বাইরে চলে যাবে, এ আমি হতে দেব না। জগারাম খালাস পাবে এবং আসল আসামী ধরা পড়বে--সেইভাবে কাজ করতে হবে।

আতালতে গোবিন্দ প্রশ্ন তুললো--আসামীর হাতের ছাপ কোথাও পাওয়া গেছে কী? কেউ আসামীকে ছুরি মারতে দেখেছে? দেখেছে কি কোন-কিছু নিয়ে বাড়ি থেকে সরে পড়তে? খুন করে হীরে-জহরত নিয়ে সরে পড়ার পর আসামী আবার ফিরে আসবে কেন? আসামী যেখানে থাকতো, সেখানে তো কিছুই নেই, তাহলে লুঠের মাল সব গেল কোথায়? এবং শেষ প্রশ্ন হত্যাকান্ডের পর লালবাজারে টেলিফোন করেছিল কে?

এসব প্রশ্নের জবাব পুলিশও পায়নি। কাজেই জগারাম দু’মাস পরে হাজত থেকে মুক্তি পেল।

তিন মাস জগারাম আর বাড়ি থেকে বেরোয় নি। সামান্য কাজকর্ম করে গুম হয়ে বসেছিল। চতুর্থ দিনে সকালে সে মহারাজকে বললো--হজুর আমি বাড়ি যাবো।

মহারাজ বললেন-- সেই ভালো, আমিও এ বাড়ি বিক্রি করে দেব। এখানে মানুষ খুন হলো, আমার হীরা-জহরত চুরি গেল,--এ বাড়ি আর রাখবো না।

--এত জিনিপত্তর?

--সব ফার্নিচার বেচে দেব।

সেদিন সন্ধ্যাবেলা মহারাজা গাড়ি নিয়ে বেরুলেন। শখের গাড়ি, নিজেই ড্রাইভ করেন। এলোমেলো খানিকটা ঘোরাফেরা করে ফিরলেন সেই রাতে আটটা সাড়ে আটটায়। দারোয়ান সদর বন্ধ করলো। জগারাম তখন রাত্রের রান্না-খাওয়ার আয়োজন করতে ব্যস্ত।

ঘন্টাখানেক পরে--অন্ধকার তখন বেশ জমাট বেঁধেছে। হঠাৎ দেখা গেল, নিঃশব্দে জগারাম গুটি গুটি বেরিয়ে এল ঘর থেকে। বাড়ির পিছন দিকে কয়েক কাঠা জমি পড়ে ছিল। সেখানে বেশ কিছু ফুল ও ফলের গাছ। মাঝে একটু বসবার মত বাঁধানো চত্বর। জগারাম সন্তর্পণে সেই চত্বরটার একটা কোণে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর চারিদিকে নজর বুলিয়ে নিয়ে একটা রুটি-কাটা ছুরি দিয়ে সে মাটি খুঁড়তে শুরু করলো। নরম মাটি--অল্পণের মধ্যেই প্রায় হাত দুয়েক গর্ত হয়ে গেল। জগারাম এবার সেখানে হাত দিয়ে ঢাকনিওয়ালা বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র বের করলো। তারপর আবার গর্তে মাটি চাপা দিয়ে পাত্রটা হাতে নিয়ে চলে গেল বাড়ির মধ্যে।

পাঁচিলের বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক--নিঃশব্দে তীèদৃষ্টিতে। কোন কিছুতেই তার নজর এড়াল না। জগারাম ভিতরে ঢুকে যেতেই সে গিয়ে টেলিফোন করলো কাছাকাছি এক বাড়ি থেকে ঃ হ্যালো! হ্যাঁ, আমি মৃণাল কথা বলছি--

রাত দশটায় মহারাজ যখন শোবার উদ্যোগ করছেন, এমন সময় টেলিফোন এলো--আপনাকে অসময়ে বিরক্ত করছি বলে কিছু মনে করবেন না। আমি আপনার নিহত সেক্রেটারী রবীন মিত্রের পরিচিত। খুনখারাপির ব্যাপার নিয়ে এক অধটু মাথা ঘামাই। রবীনবাবুর খুন ও আপনার বাড়িতে ডাকাতি নিয়ে আমি বেশ কিছু ভেবেছি। যদি আমার বিশ্লেষণ ঠিক হয়, তাহলে সমস্ত হীরে-জহরত উদ্ধার হতে পারে। খুনীর সন্ধান আমি পেয়েছি বলা যেতে পারে, তবে এজন্য আপনাকে দেড় লাখ টাকা নগদ খরচ করতে হবে। নিহত রবীনবাবুর বিধবা মাকে দিতে হবে এক লাখ টাকা, আর আমার ফী পঞ্চাশ হাজার।

--অতো টাকা এখন কোথায় পাই?

--আপনার ব্যাঙ্কে কয়েক লাখ টাকা ফিক্সড্ ডিপোজিট আছে। তা থেকে টাকাটা দেবেন। আপনার হীরে-জহরতের দাম তার চেয়ে অনেক বেশী। যদি দিতে রাজী থাকেন, কাল সকালে ‘প্রতিশ্র“তি’ লিখে রাখবেন, আমি কাজে বেরুবার পথে আপনার বাড়ি হয়ে যাবো। আপনার স্বারিত চুক্তিপত্র পেয়ে তবে আমি কাজে হাত দেবো। হয়তো কালই সমস্ত জহরত আপনি পেয়ে যাবেন। আজ সারারাত এবং কাল সকাল দশটা অবধি ভেবে দেখুন, কি করবেন।

ওপার থেকে বক্তা টেলিফোন ছেড়ে দিল।

আড়াইটের ট্রেন। একটার সময় হাওড়া স্টেশনের টিকিট ঘরের সামনে এসে লাইনে দাঁড়ালো জগারাম। তার হাতে একটা স্টিলের সুটকেস ছাড়া আর কিছু নেই। গোবিন্দ তারই জন্য অপো করছিল। এগিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে সুটকেসটা কেড়ে নিল। জগা চিৎকার করে উঠলো--একি! একি!

--এসো একবার আপিসে যেতে হবে।

--কোন আপিসে?

--এই যে রেলওয়ে পুলিশ।

--পুলিশ! পুলিশ কেন?

--দরকার আছে।

জগা ঘাবড়ে গেছে। সে এদিক-ওদিক চায়--পালানোর মতলব। গোবিন্দ বললো--পালানোর চেষ্টা ক’রো না। তার ব্যবস্থা করেই এসেছি।

তারপর সে জগার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বড় ঘড়িটার নীচে। চারপাশে কৌতূহলী জনতা। গোবিন্দ বললে-- খোলো সুটকেস। কত টাকা আছে দেখি।

--টাকা!

--হ্যাঁ মহারাজের জহরতের দাম।

--কী বলছেন।

--বাজে ব’কো না, সুটকেস খোলো। সেক্রেটারী রবীনবাবুকে খুন করে তুমি জহরত চুরি করেছিলে; এখন মাড়োয়ারীর কাছে বেচে ক’লাখ টাকা পেলে, তাই জানতে চাই।

--আমি খুন করেছি! আপনি কী বলছেন! অ্যাঁ, আপনিই তো আদালতের সেই উকিলবাবু, আপনিই তো আমাকে খালাস করে আনলেন আদালত থেকে। জগারামের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।

--হ্যাঁ, তা না আনলে তোমার এই খুন-রাহাজানি ধরা পড়তো না। তোমার সাকরেদরাও ধরা পড়তো না। এখন সুটকেস খুলে ফেলো দিকি ভাল ছেলের মতো।

জগা থর থর করে কাঁপছে। পরণে গোবিন্দর এক ধমক খেয়ে সুটকেসটা সে খুলতে বাধ্য হলো। কয়েকটি জামা-কাপড়ের নীচে একটি কাগজের প্যাকেট, প্যাকেটে তাড়া একশো টাকার নোট বাঁধা। গোবিন্দ জিজ্ঞাসা করলো--কত?

--পঞ্চাশ হাজার।

গোবিন্দ বললো--হুঁ, বাকী পচাত্তর হাজার তাহলে দলের অন্য দু’জন নিয়েছে।

তারপর সুটকেস বন্ধ করে সেটাকে হাতে নিয়ে সে বললো, এসো আমার সঙ্গে।

--কোথায়?

--যে মাড়োয়ারী টাকাটা দিয়েছে তার বাড়ি।

জগা ছিটকে সরে পড়তে যাচ্ছিল। হঠাৎ এক যুবক এসে তার হাত ধরলো। বলল--ছিঃ, ও চেষ্টা ক’রো না। চল।

বাইরে এসে পুলিশের গাড়িতে তারা গেল লালবাজার। তারপর সেখানে থেকে লোকজন নিয়ে বিবেকানন্দ রোডে এক মাড়োয়ারীর গদীতে গিয়ে হাজির।

মাড়োয়ারী মহানন্দে তাকিয়ে হেলান দিয়ে ভুঁড়িতে হাত বোলাচ্ছিল, মহারাজার দশ লাখ টাকার জহরত এক লাখ পঁচিশ হাজারে সিন্দুকজাত করেছে, এ কি কম কথা! হঠাৎ পুলিশ দেখে সে হকচকিয়ে গেল।

গোবিন্দ জিজ্ঞেস করলো--খুনীকে সাহায্য করার ব্যাপার, ....কালো টাকা কত জমিয়েছ শেঠজী? মহারাজার হীরেগুলো বের করে দাও, আর থানায় চল.....মাড়োয়ারীর মাথায় চকিতে বুদ্ধি খেলে গেল, বললো--হৈ চৈ করবেন না বাবুজী, এখানে সবাই আমায় খাতির করে। হীরে-জহরত আমি দিয়ে দিচ্ছি। আপনারা আমাকে নিয়ে আর জড়াবেন না। যা লাগে, আমি দেবো।

ঘুষে বাঙালীকে কেনা যায় বলে মাড়োয়ারীর ধারণা। সে ভুল তার ভাঙলো। তাকে লালবাজার যেতে হলো।

ঘন্টা দুয়েক পরে পুলিশ গিয়ে মহারাজের বাড়ির পিছন দিকে খুঁড়ে রক্তমাখা ছোড়াখানি বের করলো। জগার সাগরেদ দু’জন আগেই ধরা পড়েছে। তাদের মধ্যে একজন হলো দাগী আসামী। তাদের দিক থেকে নজর সরিয়ে দেবার জন্যই সে চিঠিখানি লিখেছিল।

রবীন মিত্রের হত্যার মামলা নতুন করে শুরু হলো।

গোবিন্দ ইতিপূর্বে মহারাজার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা আদায় করে নিয়েছে। লাখ টাকা সে দিয়ে এল রবীনের বৃদ্ধা মায়ের হাতে আর নিজে রাখলো পঞ্চাশ হাজার। তার মন্তব্য প্রজাদের শোষণ করা টাকার তবু কিছুটা সদ্ব্যয় হলো।

\শেষ\

* বানান ও ভাষা হুবহু রাখা হল।



Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.

home
Editor : Probir Bikash Sarker
probirsrkr06@gmail.com