একটি সমৃদ্ধ শিশুগ্রন্থবিতান

কিশোরচিত্র প্রতিবেদক

বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৩৪% হচ্ছে শিশু। সেখানেই বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। কেননা কর্মম জনসংখ্যার আধিক্য সে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি যদি তাদেরকে শিতি, সুদ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়। আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ আমরা হরদম বলে থাকি। কিন্তু তাদের আজকে নাভিশ্বাস উঠেছে যারা শহরে বসবাস করছে। যানজট, হৈহল্লা, চিৎকার, রাজনৈতিক আন্দোলন তো আছেই সেইসঙ্গে অপরিকল্পিত শহর গড়ে ওঠার ফলে না আছে পরিবেশ না আছে খেলাধূলার মাঠ। ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে শিশু-কিশোরদের ঘরের বাইরে খেলার জগৎটা। অধিকাংশ স্কুল-কলেজে নেই পর্যাপ্ত জায়গা। ফলে দৈহিক গঠন এবং স্বাস্থ্যহীনতার শিকার হয়ে পড়ছে তারা তেমনি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হচ্ছে। ঘরের বাইরে আনন্দ-বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। শুধু বাইরে কেন, ঘরের ভিতরেও ছেলেমেয়েরা মানসিক আনন্দের খোরাক বলতে তেমন কিছুই পাচ্ছে না। অনেকের বাড়িতে টেলিভিশন, কম্পিউটার-গেমস্  থাকলেও সেগুলোর ক্ষেত্রে আছে  কড়াকড়ি। আবার টিভিতে শিশু-কিশোরদের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানাদি তুলামূলকভাবে কম। ইন্টারনেট দেখার ক্ষেত্রও রয়েছে  সীমাবদ্ধতা।

প্রকৃতপক্ষে যুগের তালে তাল মিলিয়ে ছেলেমেয়েদের মেধা বিকাশে টিভি, গেমস, ইন্টারনেটের পাশাপাশি পত্রপত্রিকা এবং গ্রন্থের ভূমিকা অপরিসীম। শিশুদের জন্য প্রকাশিত পিকচার বুক, গ্রন্থ, পত্রিকা ও সাময়িকীতে যে পরিমাণ বিচিত্র এবং শিক্ষামূলক তথ্য, সংবাদ ও বিষয় থাকে তেমনটি অন্যকোনো মাধ্যমে অপ্রতুলই বলা চলে। উন্নত দেশে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় সৃজনশীল শিশুসাহিত্য ক্ষেত্রে তার এক ভাগও বাংলাদেশে ব্যয় হয় না সরকারি-বেসরকারিভাবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্কুল, কলেজে ভালো লাইব্রেরি নেই, লাইব্রেরি থাকলেও সেখানে গ্রন্থ ও জায়গার অভাব প্রচন্ড। গ্রামাঞ্চলের কথা আর নাইবা বললাম। প্রতি বছর বইমেলা ঘটা করে পালন করা হলেও মোট প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে এক শতাংশ গ্রন্থও শিশুদের  জন্য থাকে না। যেগুলো প্রকাশিত হয় সেগুলোও প্রকাশনামানের দিক দিয়ে অত্যন্ত দীনহীন। পুরোনো জনপ্রিয় গ্রন্থগুলোতো বহু বছর ধরে পুনমুর্দ্রণই হচ্ছে না।

অথচ এই কয়েক দশক আগেও বাঙালি সমাজে বই পড়া, লেখালেখির মানসিকতা ছিল। পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তোলার স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতাও ছিল। শিশু প্রজন্মের জন্য পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি থাকা যে কতখানি জরুরি এটা বর্তমান অভিভাবকরা বুঝতে পারছেন না বলেই মনে হয়। দেয়াল পত্রিকা তৈরির ঐতিহ্যটাও আজ বিলুপ্ত প্রায়। শিশুপত্রিকা তো নেই-ই বলা যায়। অথচ বইপত্রপত্রিকার বিকল্প কিছু নেই শিশু প্রজন্মের জন্য। যত বেশি ভালো, বৈচিত্রময় রঙেঢঙে বইপত্র প্রকাশিত হবে ততই খুদে পাঠকের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এবং তাদেরকে সেগুলো পড়ার সময় ও সুযোগ করে দিতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় ইচ্ছে করলে পৌরসভা লাইব্রেরি স্থাপন করতে পারে। ছেলেমেয়েরা সেখানে বইপত্র পড়ার পাশাপাশি টিভি, ইন্টারনেট, গেমস উপভোগ করার সুযোগ পেলে মেধার যেমন বিকাশ ঘটবে তেমনি সুসভ্য-সামাজিক হতে শিখবে।

গ্রন্থপাঠ মানুষকে সভ্য ও সুন্দর করে। বুদ্ধিমান জাতি গঠনের ক্ষেত্রেএই সকল সুযোগ-সুবিধা দান বর্তমান যুগে খুবই সাধারণ ব্যাপার। কী ভাবছেন আমাদের অভিভাবকরা? একদিন এই সমস্ত কথাগুলো আমার মনে হয়েছিল চমৎকার একটি গ্রন্থবিতানে ঘুরে ঘুরে যখন বিচিত্র গ্রন্থ, পত্রপত্রিকা দেখছিলাম। এমন বইয়ের দোকান ঢাকাসহ বাংলাদেশের আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। ২০০১ সালে এটি স্থাপিত হয়েছে। সম্ভবত একটি মাত্র বইয়ের দোকান যা শুধুমাত্র শিশু-কিশোরদের জন্য। পশ্চিমবঙ্গেও আমি অনেক ঘুরেছি কিন্তু এরকম একটি শিশুগ্রন্থবিতান খুঁজে পাইনি। যখনই ঢাকায় যাই ‘পাঠশালা’ নামক দোকানটিতে যেতেই হয়। কী এক সম্মোহনী শক্তি আমাকে সেখানে টেনে নিয়ে যায়। মাঝে-মাঝে অনেক ছেলেমেয়ে সেখানে আসে বইপত্র কেনা বা ঘেঁটে দেখার জন্য তাদের বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে। নিজেরা যে আসতে পারে না তা বলাই বাহুল্য কারণ ঢাকা শহরে বড়রাই নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে না, সেখানে শিশুদের স্বাধীনভাবে হাঁটাচলার কথা চিন্তার অতীত। একুশ শতকে এসেও আমাদের শিশুদের বন্দিদশা সত্যি মন খারাপ করে দেয়। যারা বয়োবৃদ্ধির সোনালি সময়েই বাইরের জগৎ সম্পর্কে জানতে অক্ষম, রাষ্ট্র ও সমাজের সমস্যা-সংকট সম্বন্ধে ধারণা নেই তারা বড় হয়ে কিভাবে জাতীয় উন্নতির জন্য উদ্যোগী হবে, লড়াই করবে বুঝতে পারি না। যখনই খুদে পাঠকদের সঙ্গে পাঠশালায় দেখা হয়েছে যে আগ্রহ, কৌতূহল এবং স্বপ্নময় আলো তাদের চোখে-মুখে দেখতে পেয়েছি সে আলো এসে আমার ছেলেবেলার স্মৃতিকে নাড়া দিয়েছে, ঝাপসা করে দিয়েছে চোখের দৃষ্টি--মনে হয়েছে আহা, আবার যদি ছেলেবেলায় ফিরে যেতে পারতাম। আবার সেই প্রিয় ছড়া, কবিতা, গল্প, রহস্যেপন্যাস, সৌরজগৎ, বিজ্ঞান, ভয়ঙ্কর জীবজন্তু, বড়মানুষের কাহিনী, গোয়েন্দাগল্পগুলো পড়তে পারতাম! কত মজাই না হত! সেই একই মজা, আনন্দগুলো ধরার জন্যই ছেলেমেয়েরা ‘পাঠশালা’য় এসে ভিড় করে যা দেখে সত্যি সত্যি মনটা আনচান করে ওঠে, আমি ওদের মধ্যে হারানো ছেলেবেলার নিজেকে কেবল খুঁজে বেড়াই। এটাও একটা আনন্দ, এটাও বয়সকালের একটা তৃপ্তি, এটাও বড়দের এক ধরনের পাঠশালা। তাই পাঠশালাকে জানাই ধন্যবাদ। ঢাকায় গেলে ‘পাঠশালা’য় যাবই যাব। বন্ধুরা তোমরাও ঘুরে এসো, বিচিত্র বই আর পত্রিকা-সাময়িকী সাজানো আছে। তোমাদের পছন্দের বইটি সেখানে পাবেই।

যোগাযোগ: পাঠশালা, ২২, আজিজ সুপার মার্কেট নিচতলা, শাহবাগ ঢাকা-১০০০, ফোন নম্বর : ৯৬৬২৬০১, ৯৬৬৪৪৬০।

ইমেইল: editor.boitha@gmail.com


Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.

home
Editor : Probir Bikash Sarker
probirsrkr06@gmail.com