
![]() কাকতালীয়ভাবে
মানুষের জীবনে কতকিছু ঘটে যায় তা যেমন বলার অপেক্ষা রাখে না তেমনি আমার জীবনে একটি
পত্রিকা খুলে দিয়েছে প্রতিভা বিকাশের নতুন ঠিকানা। সে ঘটনায় যাবার আগে আমার কিছু কথা: মুক্তিযোদ্ধা
কোটায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য সিলেট
থেকে ঢাকায় গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল বাবা ও বোন। বাসে ভ্রমণ আমার কাছে কখনো আরামদায়ক নয়
বলে বাবা ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া ট্রেনে ভ্রমণ আমার কাছে ভীষণ ভালো
লাগে। যদিও বাসের চেয়ে ট্রেনে ৩ ঘণ্টা সময় বেশি লাগে। তারপরও দীর্ঘ ৮ঘণ্টার ভ্রমণে
সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেয় প্রকৃতির চারপাশের মনোরম অপূর্ব দৃশ্য। লিখিত পরীক্ষায়
ভালোর কারণে মৌখিক পরীক্ষায় সুযোগ পেয়ে যাই। দৈনিক পত্রিকা ও সাধারণ জ্ঞানের বিভিন্ন
ধরনের বই-ই ছিল ভরসা। এ রকম প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে পূণ্যভূমি সিলেট ছাড়ি। যাত্রাপথে
টেনশনে টেনশনে প্রতি মিনিটকে এক-একটি বছরের মতো মনে হত। বাবা বুঝতে পারলেন আমার খুব
টেনশন হচ্ছে। বাবাকেও
জিজ্ঞাসা করলাম কি ধরনের প্রশ্ন করা হতে পারে? বাবা
বললেন, টেনশন করার কিছুই নেই। এক
কথায় সব উড়িয়ে দিলেন। বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। কোনো কিছুতেই তার ভয় নেই। ৫নং সেক্টরে
মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। বাবার প্রতিটি কথার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবোধ কাজ
করে। আমাকেও সেভাবে সাহস দিলেন। তাছাড়া বাবার প্রতিটি কথার মধ্যে থাকে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস।
বাবা তার সেই চিরাচরিত আত্মবিশ্বাসের সুরে বললেন, দেখো, আমার মনে হয় ওরা তোমাকে মুক্তিযুদ্ধের
বিষয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করতে পারে। বাবার কথায় মুহুর্তের মধ্যে সমস্ত দুঃশ্চিন্তা
কোথায় যেন হারিয়ে গেল। তারপর বাবাকে ছাত্র বানিয়ে নিজে শিক্ষিকা সেজে গেলাম। একে একে
বাবাকে নানা ধরনের প্রশ্ন করছি। সমস্ত প্রশ্নই ছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক। তবে বাবার কাছ
থেকে অনেক অজানা তথ্য পেয়েছি। বাবা পায়ে হেঁটে সিলেট থেকে ভারতে যান মুক্তিযুদ্ধের
ট্রেনিং নিতে। ট্রেনিং শেষে পুনরায় হেঁটে সিলেটে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দীর্ঘ
৮ ঘণ্টার ভ্রমণে বাবার যুদ্ধের সেই ভয়াল দিনগুলির কথা, কালনিশির কথাগুলো বলতে বলতে
কমলাপুর স্টেশনে চলে এলাম। বাবা সুযোগ পেলে এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর স্মৃতি
আমাদের মাঝে তুলে ধরেন। বাবার সেই বীরত্বের কথা শুনতে আমাদের ভীষণ ভালো লাগে। গর্বে
আমাদের বুকটা তখন ভরে যায়। রাতে
আমরা খালার বাসায় ছিলাম। পরদিন সকালে মিরপুর ২নং সেকশনে প্রাথমিক গণশিক্ষা অধিদপ্তরে
সকাল ১০টায় মৌখিক পরীক্ষা। যানজটের ভয়ে প্রায় ঘণ্টাখানিক আগে বাবার সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রে
পৌঁছলাম। আমার আগে যারা পরীক্ষা দিয়ে বের হচ্ছে তাদের অনেককেই প্রশ্নের ধরণ সম্বন্ধে
জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সবার মুখে একই কথা। অধিকাংশ প্রশ্ন ছিল মুক্তিযুদ্ধের ওপর। বাবার
কথাই ঠিক হল। এরপর শিক্ষকরা আমাকেও মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। আমি প্রতিটি
প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলাম। বোর্ডের সবাই আমার উত্তরে মুগ্ধ হলেন। সবাই আমার প্রশংসা
করলেন। পরীক্ষা অসম্ভব ভালো হল বলে বাবাকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে আবদার করলাম। আসলে
চিড়িয়াখানায় কখনো যাইনি বলে এ সুযোগে বাবা চিড়িয়াখানায় নিয়ে গেলেন। চিড়িয়াখানায় গিয়ে
মুগ্ধ হলাম। এতদিন টেলিভিশনে বিভিন্ন চ্যানেলে বিচিত্র সব প্রাণী দেখেছি। এখন খুব কাছে
থেকে সরাসরি দেখলাম। কাছ থেকে দেখার আনন্দই আলাদা। বিকেল থেকে সন্ধ্যায় এই অল্প সময়ে
সব দেখে মন জুড়ে গেল। পরদিন
পূণ্যভূমি সিলেট ফিরে যাব বলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। বাবা আগেই ট্রেনের টিকিট এনে
রেখেছিলেন। শহরের তীব্র যানজটে নাকাল হয়ে ট্রেন ছাড়ার ১০ মিনিট আগে কমলাপুর স্টেশনে
পৌঁছলাম। ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ের ১৫ মিনিট পর ছাড়ল। বাবা বললেন, এই হচ্ছে বাংলাদেশের
ট্রেন। তারপর আমাদের বললেন, জাপানের ট্রেনের কথা শুনেছ? ওখানে নির্দিষ্ট সময়ের ১ মিনিট
আগে-পরে কখনো ট্রেন ছাড়ে না। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ট্রেন স্টেশন ছাড়ে এবং
পৌঁছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে সময়ের মূল্য নেই। রেলওয়ের কাছে ওদের স্বার্থের বেলায়
ষোলআনা। আর পাবলিকের বেলায় দু’আনাও না! ট্রেন
খিলগাঁও ফ্লাইওভার আসার পর হঠাৎ দেখলাম আমার পাশের সিটের এক কিশোরী একটি পত্রিকা পড়ছে।
একটু অন্যরকম মনো হল আমার কাছে। আমাদের দেশে যেসব পত্রিকা স্বভাবতই বের হয় এটা তার
চেয়ে একটু আলাদা। হাতে নিয়েই চমকে গেলাম। মনে হল, টাইম ম্যাগাজিনের টু-ইন। প্রথমে মুগ্ধ
হলাম পত্রিকাটির নামে, শ্লোগানে। পাশাপাশি পত্রিকার মেকআপ, গেটআপ এবং বিষয়বস্তু নির্বাচনে।
ছোটরা লিখছে এবং আঁকছে। হয়ত একদিন ওরাই সম্পাদনা করবে। ঢাকা ও সিলেটে অসংখ্য পত্রিকার
ছড়াছড়ি। ছোটদের পত্রিকা নেই বললেই চলে। বড়দের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল আছে। আছে দৈনিক,
সাপ্তাহিক। এমনকি বাৎসরিক পত্রিকাও। বড়দের ভালোলাগা মন্দলাগা বলার জায়গা আছে। কিন্তু
ছোটদের নেই। অথচ মুখে বলছি ছোটরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা?
তাও আবার একুশ শতকে! ‘কিশোরচিত্র’ হাতে পেয়ে সব ধারণা
পাল্টে গেল! প্রায়
৮ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণে পুরো পত্রিকাটি মনে হল নয় কি দশবার পড়লাম। যতই পড়ছি ততই মুগ্ধ
হচ্ছি! ছোটদের লেখার পাশাপাশি ছবি। এক কথায় অসাধারণ। ওদের প্রতিভা বিকাশ হচ্ছে। অসম্ভব
ভালো লাগছিল। তাই তো এই ভ্রমণে কখন যে সিলেট চলে এলাম টের-ই পেলাম না। ভ্রমণের সমস্ত
ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল কিশোরচিত্রের মে সংখ্যাটি। পড়া শেষে মনে হল কিশোরচিত্রের
পরিবারকে প্রীতি, শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো উচিত। লেখার
শুরুই মনে পড়ে গেল, ছোট ছোট বালু কণা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।
শিক্ষার আলো পেলে অধিকারবঞ্চিত শিশুরা যে উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারে তারই জ্বলন্ত
উদাহরণ: অধিকারবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে গড়া টোকাই স্কুল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এদের সুযোগ-সুবিধা
দিলে এরাই ভবিষ্যতে আলোকিত দেশ গড়বে। যাদের নিরলস প্রচেষ্টায় এই টোকাই স্কুল গড়ে উঠেছে
তারাই হবেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আদর্শ। আর তখনই এ আদর্শের অংশীদার হবে কিশোরচিত্র।
কিশোরচিত্রের কারণে সারাবিশ্বের অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা এই স্কুলকে অনুকরণ,
অনুসরণ করে আলোকিত বিশ্ব উপহার দেবে। এছাড়া স্বাধীনা জামান, জান্নাতি খান আন্নি, খান
হাসিবুজ্জামান এবং দানিয়েলের মতো অসংখ্য প্রতিভার জন্ম হবে। কিশোরচিত্র এভাবে অসংখ্য
মহৎ কাজের সাক্ষী হয়ে নিত্য নতুন ইতিহাস গড়বে। কিশোরচিত্রের মাধ্যমে আজকের মেধাবী প্রজন্ম
বদলে দেবে সমাজ, দেশ এমনকি গোটা বিশ্ব। আমার কাছে মনে হয় কিশোরচিত্রের পক্ষেই এটা সম্ভব।
তেমনি সম্ভব কিশোরচিত্রের মাধ্যমে শিশু কিশোরদের প্রতিভা বিকাশ ও মাতৃভাষা চর্চা। শিশুরা
আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, দেশ গড়ার রূপকার। সুখী সমৃদ্ধ স্বপ্নের দেশ সবারই কাম্য। তাই
প্রতিটি শিশু স্বপ্ন দেখে সুখী সমৃদ্ধ স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। আমার কাছে মনে হয় কিশোরচিত্র
হচ্ছে শিশু কিশোরদের আলোকিত করার চাবিকাঠি। তাই কিশোরচিত্রের সাতকাহনের ভিড়ে প্রত্যাশা
অনেক। কিশোরচিত্রের আকাশচুম্বী সাফল্যে স্বপ্ন দেখি দেশ-বিদেশের অসংখ্য পত্রিকার ভিড়ে
এটাই হবে এই গ্রহের শ্রেষ্ঠ পত্রিকা। স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছে যাবে আপন মহিমায়। সেদিন
বেশি দূরে নয়। কিশোরচিত্রের আলোয় আলোকিত হবে দেশ, জাতি। বহির্বিশ্বেও এই আলো ছড়িয়ে
পড়বে। দীর্ঘ পথ ভ্রমণে কিশোরচিত্র পরিবারে যেন কোনো প্রকার ক্লান্তির ছাপ স্পর্শ করতে
না পারে। অন্ধজনেরাও যেন সেই আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। অসংখ্য সিঁড়ি বেয়ে কিশোরচিত্র
তার আপন ঠিকানায় সঠিক সময়ে পৌঁছে যাবে। পাড়ি দিবে অনন্তকাল। কখনো হারাবে না, ফুরাবে
না। যত বাধা বিপত্তি আসুক না কেন, কখনো পিছপা হবে না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে চাওয়াগুলো
মনে হয় খুব বেশি নয়। কিশোরচিত্র যেন হয় কালের সাক্ষী। কিশোরচিত্রের তথ্য ভাণ্ডার আরো
সমৃদ্ধ হোক। এটাই একমাত্র অনুরোধ। শেষ
অনুরোধ গুণী সম্পাদক প্রবীর বিকাশ সরকারের কাছে তিনি যেন বটবৃক্ষের মতো শত বছর কিশোরচিত্রকে
আগলে রাখেন। কিশোরচিত্র পরিবারকে আন্তরিক অভিনন্দন, কৃতজ্ঞতা এবং ফুলেল শুভেচ্ছা। পত্রিকাটি
নিয়মিত পাওয়ার আশা করছি। সদস্য, সুরমা
বয়েজ ক্লাব, কলবাখানি ওয়াপদা রোড, সিলেট ![]() রাত
১১.৩০। ট্রেনের প্রতীক্ষায় বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে। উদ্দেশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছোটদের
পত্রিকা কিশোরচিত্র ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিতরণ। সহযোগী আশরাফভাই কমলাপুর থেকে উঠেছেন।
বার বার ফোন। ট্রেন কি ছেড়েছে? উত্তর একটাই: একটু পরই ছাড়বে। সেই একটুর অবসান হল ২৫
মিনিট পর। যা-ই হোক, অবশেষে ট্রেন ছাড়ল। আমি ট্রেনে উঠলাম রাত ১২টা ছুঁইছুঁই। কিশোরচিত্র
হাতে নিয়ে ভাবতে লাগলাম, কিভাবে কি করা যায়। কিভাবে সব ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিতরণ করা
যায়। ভাবনার সঙ্গে যোগ হল রাতের আঁধার। বাইরের দিকে তাকিয়ে নিবিষ্ট মনে ভাবনা একটাই:
কিশোরচিত্র। ভাবছি তো ভাবছিই। মাঝে মাঝে আবার পরামর্শ করছি আশরাফভাইয়ের সঙ্গে। ঘণ্টাখানেক
পর মোটামুটি একটা পরিকল্পনা সাজালাম। তারপর কেমন যেন একটা স্বস্তিবোধ করলাম। তারপরও
যেন ভাবনার অন্ত নেই। এত কষ্ট করে যাচ্ছি--সফল হব তো? আত্মবিশ্বাস আছে। তারপরও প্রশ্ন
জাগে। আগে থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করে রেখেছি। দুশ্চিন্তার কোনো
কারণ নেই। কিন্তু তারপরও কেন জানি.....। ভাবতে ভাবতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন।
খুব তাড়াতাড়িই চলে এসেছি মনে হল। না, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় তিনটা। সময় কম
লাগেনি। এতটা সময় ভাবনার মাঝে ছিলাম বলে বুঝতে পারেনি। বন্ধুবর
হান্নান আগে থেকেই হোটেলে বুকিং দিয়ে রেখেছে। নাজ হোটেলে আরেক বন্ধু বরকতকে নিয়ে আমাদের
প্রতীক্ষায়। পত্রিকা, নিজের ব্যাগ নিয়ে রিকশা করে হোটেলে। পরিচয়পর্ব শেষে হোটেলে থেকে
গেল আশরাফভাই আর ভাবি। আমি হান্নানের বাসায়। প্রায় অনেকদিন পর দেখা। গল্প আর আড্ডায়
রাত প্রায় শেষ হল বলে। জানি সকালেই বেরুতে হবে। তারপরও বন্ধু বলে কথা। কথা বলতে বলতে
নিজের অজান্তেই ঘুম। ভাঙল সকাল ৮টায়। বরকত ও তার ভাই প্রভাতের গলাবাজিতে। কিন্তু ঘুম
ভাঙলে কি হবে উঠতে যে ইচ্ছে করছে না। এমনিতেই অনেক বেলা করে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস।
কিন্তু মিশন বলে কথা। তাও আবার কিশোরচিত্রের। ঝটপট উঠে গোসল সেরে প্রস্তুত। নাস্তা
করেই বেরুব। ওইদিকে আশরাফভাই ও ভাবি প্রস্তুত। রওয়ানা দিলাম মূল লক্ষ্য সাধনে। যত
ভাবনা যত পরামর্শই হোক বাস্তবে গেলে বোঝা যায় বাস্তবায়ন করা কতটা কঠিন। নিজের কাছে
কেমন কেমন জানি লাগছিল। নিজের শহর, বেড়ে উঠার পরিবেশ, চেনা অচেনা মানুষ--সবকিছু মিলিয়ে
একটু অস্বস্তিই বলা যায়। সাহস পাচ্ছিলাম বন্ধু হান্নান আর অফিসের সহযোগী আশরাফভাইয়ের
সঙ্গ পেয়ে। মিশনের কাজ শুরু করলাম আইডিয়াল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যাণ্ড কলেজের মধ্য
দিয়ে। দুর্ভাগ্য অধ্যক্ষ সাহেব অনুপস্থিত। কিন্তু তার অনুপস্থিতি বুঝতে দিলেন না ওই
স্কুলের একজন শিক্ষক হায়দার স্যার। তিনি আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। তারপর একজন
শিক্ষককে নিয়ে দশম শ্রেণীতে। বললাম,
আচ্ছা, তোমাদের মাঝে কে কে আছো যারা নিজে ছড়া, কবিতা, গল্প লিখো? ভাগাভাগি করতে চাও
নিজেদের আনন্দ-দুঃখ-কষ্টের কথা। প্রকাশ করতে চাও নিজের জানা-অজানা, ভালো লাগা-মন্দ
লাগা, ছোটবেলার মজার কোনো স্মৃতি। আমরাই প্রকাশ করব। প্রথমে
ইতস্ততা। তারপর বেশ কয়েকজন সাড়া দিল। কয়েকজনের মাঝে পত্রিকা দিলাম। বেলি ফুলের গন্ধে
ভরা ১৬ পৃষ্ঠার অফসেট পেপারের ট্যাবলয়েড কিশোরচিত্র পেয়ে অবাকই হতে হয়েছে তাদের। নেড়েছেড়ে
দেখে সত্যিই হতবাক! তাদের মুগ্ধ দৃষ্টিতে আমিও তৃপ্ত। তাদের একটাই প্রশ্ন: নিয়মিত পাব
তো কিশোরচিত্র? আমাদের লেখা ছাপা হবে তো? প্লীজ, আমাকে আরও এক কপি দেন না? তারপর নবম,
অষ্টম, সপ্তম, ষষ্ঠ প্রতিটি ক্লাশেরই বিভিন্ন সেকশনে কিশোরচিত্র সম্পর্কিত যে মন্তব্য,
সহযোগিতার আশ্বাস আর ভালোবাসা পেয়েছি তাতে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ বেড়ে গেছে। ভ্রমণের
সব ক্লান্তি আর দুশ্চিন্ত্মার বদলে দ্বিগুণ উৎসাহ পেলাম। ভাবতে ভালোই লাগে যে, পত্রিকাটি
ছাত্রছাত্রীদের মাঝে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ছোটদের পত্রিকা তারা আর পায়নি। এটাই
প্রথম। ফটোসেশন, শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপচারিতা আর অবশেষে দেয়াল-পেস্টিং করে যখন স্কুল
ত্যাগ করব ঠিক তখনই শিক্ষার্থীদের তৃপ্তিময় দৃষ্টি আমাকে আবার স্কুলে যাওয়ার আগাম দাওয়াত
করে রাখল। ভাবছিলাম থাকি না আরও কিছুক্ষণ। কিন্তু ভাবনার ছেদ পড়ে যখন মনে হল আরও কয়েকটি
স্কুলে যাবার কথা। যেতেই হবে যেহেতু একটা মিশন বা লক্ষ্য পূরণে বেরিয়েছি। গেলাম
আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। তখন স্কুলের টিফিন শুরু হবে হবে। প্রধান শিক্ষিকার
কাছে কিশোরচিত্র দিলাম। গভীর দৃষ্টিতে পড়লেন। তিনি বললেন, ছোটদের নিয়ে এরকম ভাবনার
লোকও বুঝি এখনো আছে! সত্যিই অবাক করল পত্রিকাটি! আমি আনন্দিত হলাম। টিফিন
পিরিয়ডে ছাত্রীরা তখন মাঠে। একজন সহকারী শিক্ষককে দিলেন ক্লাশে নিয়ে যাওয়ার জন্য। অষ্টম
শ্রেণী দিয়ে শুরু। যতজন ছাত্রী বসেছিল শ্রেণীকক্ষে তারচেয়েও বেশি ছিল দাঁড়িয়ে। ঠাঁই
নেই। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা! একেবারে সবাই চুপ। জানালাম কিশোরচিত্রর কথা। হাতে পেয়ে খুশিতে
আটখানা অবস্থা তাদের! এই স্কুলেরই একজনের লেখা ছাপা হয়েছে। তাদের স্কুলের নামও ছাপা
হয়েছে। ছাপার অক্ষরে নিজের স্কুলের নাম দেখতে কার না ভালো লাগে। তা-ও আবার পত্রিকায়।
সত্যিই অনেক গর্বের, অনেক আনন্দের। অষ্টম শ্রেণী থেকে বেরুতেই অনেকের আবদার আমাদের
ক্লাশে আসেন, আমাদের ক্লাশে আসেন। কিন্তু কার কথা রাখব। কচি, নিষ্পাপ মুখগুলো দেখে
কারও কথাই ফেলতে ইচ্ছে করছে না। সান্ত্বনা দিলাম--সব ক্লাশেই যাব। তারপর নবম, দশম,
ষষ্ঠ, সপ্তম। পত্রিকা পেয়ে তাদের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও ভালোলাগা দেখে সত্যিই সার্থক আমি।
প্রত্যেককে একটি করে কপি দিতে পারিনি। তাই দেয়াল-পেস্টিং করে দিয়েছি যেন সবাই পড়তে
পারে। যারা পত্রিকা পেয়েছে তারা পড়ে পরের দিন অন্যকেও দেবে যেন তারা পড়তে পারে। পর্যায়ক্রমে
সবাই পড়তে পারবে। আমার অনুরোধ তারা মেনে নিল। স্কুল থেকে যখন বের হচ্ছি তখন কতই বা
বয়স হবে মেয়েটির? আট কি নয়? বলল, আমাকে একটি পত্রিকা দিতেই হবে। তার চাওয়ার ধরন দেখে
আর না করতে পারিনি। এত ভালোবাসা কিশোরচিত্রের প্রতি! এটা ভালোলাগা মুহূর্তগুলোর একটি।
না বলে কি আর পারি? এরপর
গেলাম গভ:মডেল গার্লস হাই স্কুল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ছুটি হয়ে যাবে প্রায়। কোনোরকমে এসে
পৌঁছালাম স্কুলে। একজন সিনিয়র শিক্ষিকার সঙ্গে কথা বলে ছুটলাম ক্লাশে ক্লাশে। দশম
শ্রেণী। বিজ্ঞান শাখা। পত্রিকা দিলাম। দেখল সবাই। খুশিতে বিহ্বল! লেখা পাঠাবে। ছাপার
নিশ্চয়তা চাচ্ছে। দিলাম। ভালো হলে ঠেকায় কে? অনেকেই জানতে পেয়েছে পত্রিকাটা কোত্থেকে
বের হয়, কে অর্থায়ন করেন, তার কি লাভ? উত্তর: জাপান। দুজন জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি
ও তিনজন জাপানি নাগরিক। লাভ? ছোটদের প্রতিভা বিকাশ। অবাক হয়েছে ছাত্রছাত্রীরা। এই স্কুলের
একজন শিক্ষক বললেন, এরকম অনেকেই আসে কিন্তু পরে আর তাদের খবর মেলে না। তাকে কথা দিলাম
আমাদের বেলায় অবশ্য এরকম হবে না। আমরা চেষ্টা করছি, বড়দের আগ্রহ ও সহযোগিতা পেলে অবশ্যই
এই কাগজ একদিন সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকও হয়ে যেতে পারে। এবারও
সেই স্কুলে আমি গিয়েছিলাম। খুব মনে পড়ে মেয়েটির কথা। ঠিক ওই ক্লাশে গিয়ে বললাম, এই
ক্লাশেরই কেউ একজন বলেছিল, আমাদের পত্রিকা কিশোরচিত্র আবার আসবে কিনা তার সন্দেহ আছে।
জানি না সে কে। জানতেও চাইনি। চিনতেও চাইনি। কেউ একজন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, স্যার...
ওই... ওই। লজ্জায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা তার। কাছে গিয়ে তাকে বললাম, কিশোরচিত্র আবার
এসেছে। এটা তোমার জন্য। ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করে বলল, আবার আসবেন। একজনের কথা না উল্লেখ
করলেই নয়, তিনি হলেন গভ:মডেল গার্লস হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষিকা পারভীন আক্তার। তাঁর
সহযোগিতা সত্যিই মনে রাখার মতো। অজস্র ধন্যবাদ তাকে। অনেকের
ধারণা, তাদের ভালোবাসার, তাদের নিয়ে কাজ করার, সচেতন করার জন্য লোকও আছেন তাহলে? বিভিন্ন
কারণে তাদের মতামত জানতে তাদের ঠিকানা লিখে দিতে বললাম। আর এর উপরে লিখবে যে যা লিখবে
তার বিভাগ। যেমন ছড়া/কবিতা/গল্প/অঙ্কন/ভালো বা মন্দ লাগা/কোনো মুহূর্তের অনুভূতি ইত্যাদি।
কেউ কেউ তো অঙ্কনই করতে বসে গেল! পত্রিকা বিতরণ, ক্লাশে ক্লাশে ফটোসেশন শেষ। পত্রিকার
ওয়াল পেস্টিং করছি। ৫ম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক ছাত্র পাশের বাসা থেকে এসে জিজ্ঞেস করছে,
এটা কি? পত্রিকা। একটা দেওয়া যাবে? দিলাম। আচ্ছা, আমি কবিতা দিলেও কি ছাপা হবে? হ্যাঁ,
হবে। কোনো কথা নেই, খানিক পর এসে হাজির। বলল, নিন আমার কবিতা। অবাক হলাম! হাসিভরা মুখ
নিয়ে আশরাফভাইকে বললাম, দেখেন কবিতা নিয়ে এসেছে। তারও তৃপ্তিময় হাসি। নিজের লেখা ছাপাবার
এত আকুলতা, আকাঙ্ক্ষা? আহা, মনটা ভরে গেল। আসলে
অনেক শিশুর মাঝেই বিভিন্ন ধরনের প্রতিভা বিদ্যমান। পাঠ্য বই পড়া ছাড়া তারা আরও কিছু
জানে। কিন্তু প্রকাশ করার কোনো জায়গা পায় না, মিডিয়াও নেই। জানাতে পারে না তাদের আকুলি-বিকুলি
করা কথাগুলো। কিন্তু কিশোরচিত্র তাদের সেই ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। স্কুল
থেকে বের হলাম। বিকাল তখন সাড়ে ৪টা। দুপুরের খাবার তখনও হয়নি। পেটে বিস্তর ক্ষুধা।
দুপুরের খাবার শেষ করে আবার পথচলা। ২৪
মার্চ। সকাল সাড়ে ১০টা। বাকাইল উচ্চ বিদ্যালয়। আমার বেড়ে উঠার স্কুল। ভালো লাগার স্কুল।
শেখার স্কুল--যার প্রতিটি ইট, বালুতে মিশে আছে আমার স্মৃতিময় দিনগুলোর প্রতিটি ক্ষণ।
প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলে ক্লাশে ক্লাশে গেলাম কিশোরচিত্র হাতে। গ্রামের
স্কুল। ইণ্টারনেট, প্রিণ্ট আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কথা যাই বলুন না কেন? কতটা সুযোগ
পায় তারা এসবের? হয়ত কেউ পায় একটু আধটু। তবে বেশির ভাগই পায় না। এই কিশোরচিত্রই তাদের
পথ দেখাতে পারে, জানাতে পারে, এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাদের না বলা কথা, দাবিদাওয়া,
চাওয়াপাওয়া, দুঃখ-কষ্ট, কবিতা, ছড়া, অঙ্কন প্রকাশ করতে পারে। নিজের মাঝে তখন একটু হলেও
আনন্দ অনুভব করতে পারবে। কিশোরচিত্রকে তারা গ্রহণ করেছে আনন্দচিত্তে, করে নিয়েছে বন্ধু,
মাধ্যম পেয়েছে প্রতিভা বিকাশের। অবশেষে দুই জায়গায় ওয়াল পেস্টিং করে ঢাকার উদ্দেশে
রওয়ানা। ফেরার
সময় ভালোলাগা মুহূর্তগুলো, নিষ্পাপ মুখের হাসি, আবেগ, উচ্ছ্বাস, কিশোরচিত্র পাওয়ার
আনন্দ সবকিছুই আমাকে তাড়া করে ফিরছিল। কখন যে ঢাকায় এসে পৌঁছালাম টেরই পেলাম না। ফিরে
আসতে মন চাইছিল না। কিন্তু বাস্তবতা.....। ১০
দিন পর... ঢাকায়
ডাকযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে একটি গল্প পেলাম। গভ:মডেল গার্লস হাই স্কুল, ষষ্ঠ শ্রেণীর
একজন ছাত্রী। সঙ্গত কারণেই নামটি বলছি না। গল্পটা মনোযোগ দিয়ে পড়ে কিছুটা অসঙ্গতি চোখে
পড়ল। প্রয়োজন হল মেয়েটির সাথে কথা বলার। মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে মেয়েটির মা জানায়-
সে এখনো স্কুলে। ফিরবে বিকেলবেলা। ফিরে এলে আপনাকে ফোন দিতে বলব। কথা শুনে মনে হল অসঙ্গতিটা
তাকে বলা যায়। বললাম। উত্তরে বললেন, তিনিও গল্পটি পড়েছেন। অসঙ্গতিটা তার চোখেও পড়েছে।
মেয়েটির সঙ্গে এ নিয়ে কথাও হয়েছে। মেয়েটি তার মাকে গল্পের মূল ভাব তার মতো করে বোঝাবার
চেষ্টা করেছে। ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা রাখব প্রায়। ওই প্রান্ত থেকে তিনি বললেন, ও এই
গল্পটি বাথরুমে বসে লিখেছে। শুনে আমি কিছুটা আঁতকেই উঠেছি বলা যায়। তড়িৎ প্রশ্ন, কেন?
বাথরুমে বসে লিখবে কেন? উত্তর: ওর বাবা এসব গল্প লেখা পছন্দ করেন না। তাই সে লুকিয়ে
লুকিয়ে লিখেছে। মা হয়ে কিভাবে এসব বলেন? কিছুটা লজ্জাও হয়ত পেয়েছেন। অনেক কথার পর বোঝালাম,
মেয়েটিকে লিখতে দিন। ওর প্রতিভা আছে। বিকশিত হতে দিন। বাধা নয়, উৎসাহ দিন। তিনি প্রতিশ্রুতি
দিলেন। ভাবতে
অবাক লাগে, কতটা আপন করে নিয়েছে কিশোরচিত্রকে মেয়েটি! কতটা ভালোবেসেছে কিশোরচিত্রকে!
যার জন্য সে বাথরুমে বসে গল্প লিখেছে। ঘণ্টাখানেক পর ভাবনার ছেদ পড়ল একটি ফোন পেয়ে।
আমি... ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বলছি। গল্পের প্রয়োজনীয় কথা শেষে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি
নাকি বাথরুমে বসে লিখেছ? লজ্জার হাসি হেসে আমাকে বলল, বাবা আমাকে এসব লিখতে দেয় না।
চুপিচুপি করে লিখতে হয়েছে। তাই কিছু অসঙ্গতি....। কথাটুকু
ওর মুখ থেকে শোনার পর গর্বে আমার বুকটা ভরে গেল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মিশনের সব ক্লান্তি
যেন নিমিষে উবে গেল। মিশন সার্থক। মেয়েটির বাবাকে অনুরোধ করেছি, প্লীজ, ওকে ওর মতো
করে বড় হতে দিন। ওকে আনন্দে থাকতে দিন। শিশু-কিশোরদের যদি অভিভাবকরা আনন্দ দিতে না
পারে তাহলে ওরা কেন আমাদেরকে আনন্দ দেবে? ধন্যবাদ
মেয়েটিকে। ধন্যবাদ মেয়েটির সাহসকে। তুমি এগিয়ে যাও। তোমার জন্য হয়ত সামনে অনেক বড় কিছু
অপেক্ষা করছে। লেখক
: প্রধান সমন্বয়ক, কিশোরচিত্র Powerd by Manchitro Publishers, 2011 Copyright © All Rights Reserved.
আমি
একজন বাংলাদেশের নাগরিক। আমি গত ৫ মে ইন্ডিয়া ভ্রমণ করেছি। ইন্ডিয়া বাংলাদেশের একটি
প্রতিবেশী রাষ্ট্র। বাংলাদেশের মানচিত্রে তিন দিকেই ইন্ডিয়া দেখা যায়। এই দুই দেশ পাশাপাশি
অবস্থিত হলেও এই দুই দেশের সংস্কৃতি সভ্যতা, আচার-আচরণ প্রভৃতিতে প্রায় অনেকটা বৈসাদৃশ্য
লক্ষণীয়। আমি
ইন্ডিয়ার শিলিগুড়িতে গিয়েছিলাম। তাই সেখানকার কথা বলছি। শিলিগুড়ি
ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট শহর। সেখানকার প্রায় অধিকাংশ লোকেরা বাংলা ও হিন্দি
উভয় ভাষাতেই কথা বলে। তাদের প্রধান খাদ্য ভাত। তাছাড়া মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি
সবই তারা খায়। তাদের খাবারের স্বাদ একটু ভিন্ন।
সেখানকার ছেলে মেয়েরা শার্ট-প্যান্ট, শাড়ি ইত্যাদি পরিধান করে থাকে। কিন্তু বাড়িতে
তাদের পোশাকের ধরন অন্যরকম। ছেলেরা বেশিরভাগ জামা ও হাফ প্যান্ট পরিধান করে থাকে। আর মেয়েরা ম্যাক্সি পরে
থাকে। তারা আমাদের মতোই সারাদিন কাজ করে ও কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে আসে। ছুটির দিনগুলোতে
তারা আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বেড়াতে চলে যায়। তারা
বিভিন্ন পার্ক, উদ্যান, মেলা, সিনেমা হল ইত্যাদি আনন্দদায়ক স্থানে সময় কাটায়। তারা
বিভিন্ন ঘরোয়া ও বিদেশি খেলা খেলতে পছন্দ করে। বিশেষ করে ছোট ছেলেমেয়েরা ক্রিকেট, ফুটবল,
কাবাডি, ক্যারাম দাবা, ভিডিও গেমস ইত্যাদি খেলতে পছন্দ করে। তারা মাঝে মাঝে বনভোজন
করতেও ভালোবাসে। সুযোগ পেলে তারা কয়েকজন মিলে একটা জায়গা পছন্দ করে সেখানে চলে যায়
বনভোজন করতে। যেহেতু
সেখানটায় হিন্দু বেশি তাই সেখানে মন্দিরও বেশি। তারা মন্দিরেও মাঝে মাঝে প্রার্থনা
করতে যায়। তাছাড়া আরো বিভিন্ন ধর্মের লোক সেখানে আছে। যেমন মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ,
জৈন, শিখ ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের লোক সেখানে রয়েছে। তাদের খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা, আচরণ
একেক রকম। হিন্দি ইন্ডিয়ার রাষ্ট্র ভাষা হলেও প্রায় ২০ এরও অধিক রকমের ভাষা সেখানে
রয়েছে। শিলিগুড়ির ছেলেমেয়েরা এত ভাষা শেখে না, তারা প্রধানত বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি
এই তিন ভাষাই শেখে। বাংলাতে কথা বললেও তারা কথার সাথে আমাদের কথার কিছুটা অমিল আছে।
সেখানে প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায়। রাস্তাঘাট আমাদের দেশের মতোই পাকা। কিন্তু রাস্তায়
আমাদের দেশের মতো এত রিক্সাদেখা যায় না। সেখানে
সাইকেল আর মোটরসাইকেলই বেশি। প্রায় প্রত্যেকেই সাইকেল, মোটরসাইকেল চালাতে পারে এবং
সেভাবেই যাতায়াত করে। সেখানে মেয়েদেরকেও এগুলো চালাতে দেখা যায়। সেখানকার মহিলারা আমাদের
দেশের মহিলাদের মতো নয়। তারা অনেকটা স্বাধীন তারা প্রায় সব কাজই নিজেরা করে। অন্যের উপর নির্ভর
করে না। তারা রান্নাবান্না, হাটবাজার, সংসার দেখাশুনা, ছেলেমেয়েদের পড়ানো, লালন-পালন
করা, বিভিন্ন ব্যবসা চাকরি করা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সাইকেল চালিয়ে যাওয়া ইত্যাদি
প্রায় সব কাজই তারা নির্ভয়ে করে। তারা
আমাদের মতোই তিনবার খায়। যেমন সকালে কিছু হালকা খাবার যেমন রুটি, চা, বিস্কুট ইত্যাদি। দুপুরে কিছু ভারী খাবার খায়
এবং রাত অল্প কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেখানকার
লেখাপড়ার ধরন আমাদের থেকে ভিন্ন। সেখানে দশম ক্লাস পর্যন্ত সকলকে পড়তে হয় অর্থাৎ সায়েন্স,
কমার্স ইত্যাদির বিষয় সবই পড়তে হয়। তাদের মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা বছরের মাঝামাঝি
সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। আমি
ইন্ডিয়ায় চ্যাংরাবান্দা বর্ডার দিয়ে গিয়েছি। চ্যাংরাবান্দা বর্ডার অন্যান্য বর্ডারের
মতো নয় এ জায়গাটা একটু অন্যরকম। চারদিকে গাছপালা। অনেক দূরে দূরে ছোট ছোট ঘর দেখা যায়।
কিছুটা পর পর ছোট ছাউনির ঘর যেগুলো চেকপোস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চেকপোস্টে পরিদর্শকদের
চেক করা হয় অর্থাৎ তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়; পাসপোর্ট দেখা হয়, ব্যাগ লাগেজ চেক
করা হয়। সেখানে পরিদর্শকদের বসার জন্য কিংবা বিশ্রাম নেয়ার জন্য কোন জায়গা নেই। আমরা
চেকপোস্টে কাছ শেষে টাকা পরিবর্তন করে অর্থাৎ ইন্ডিয়ান টাকা নিয়ে শিলিগুড়ির দিকে রওনা
হলাম। আমরা বাসে করে ভ্রমণ করেছিলাম। সারারাত গাড়ি চলাচল করে। যমুনা সেতু, রংপুর, লালমনিরহাট
ইত্যাদি অতিক্রম করে আমাদের বাস সারারাত চলার পর সকালে বর্ডারে গিয়ে পৌঁছুল, তখনো
কিছু কিছু জায়গায় বেশ অন্ধকার ছিল। মাঝখানে
রাস্তা, চারদিকে ঘন বড় বড় গাছ। কোন মানুষ দেখা যায় না। সেখানে দিয়ে প্রায় অনেকটা
সময় ধরে বাস যায়। আমি
এর আগেও দুইবার শিলিগুড়িতে গিয়েছি। এবার আমি সেখানে ২০ দিন ছিলাম। এবং ২০ দিন পরে ঢাকায় চলে আসি। তাপস পাল আইডিয়াল কলেজ, ঢাকার দ্বাদশ শ্রেণীর
ছাত্র
|