ভূমিকম্পের দেশ জাপান। এই দেশে সর্বক্ষণই কোথাও না কোথাও ভূকম্পন সংঘটিত হচ্ছে যা শরীরে অনুভূত হয়। এই পর্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প একাধিকবার হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। কিন্তু সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে ১১ মার্চ, (২০১১) মধ্যাহ্ন ২:৪৬ মিনিটে সংঘটিত মহাভূমিকম্প এবং তৎসম্পর্কিত মহাৎসুনামি। পূর্ব-উত্তর অঞ্চলের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ম্যাগনিচুড ৯.০, যাকে মহাপ্রলয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর ৎসুনামি বা জলোচ্ছ্বাস ছিল ঘণ্টায় ৫০০ কিমি গতিসম্পন্ন! এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমুদ্রতীরবর্তী কয়েকটি জেলাকে দারুণ তছনছ করে দিয়েছে। জেলাগুলো যথাক্রমে মিয়াগি, ইওয়াতে, ফুকুশিমা, ছেনদাই আর ইবারাকি। সারা জাপান জুড়েই সুতীব্র ভূকম্পন চলেছে তিন মিনিট কাল! কয়েকশ' কিমি দূরে অবস্থিত রাজধানী টোকিও পর্যন্ত এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল বিপজ্জক। যদিওবা কিছুই হয়নি। কিন্তু ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলসমূহে জানমালের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। ৎসুনামির আগ্রাসী স্রোত কয়েক মিনিটেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কয়েকটি উপকূলীয় শহরকে। নিখোঁজ হয়েছেন ১১ হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে এই মহাপ্রলয়ের শিকার হয়েছেন ২৭,০০০ নাগরিক যাদের মধ্যে রয়েছে অনেক শিশু, কিশোর ও কিশোরী। তাদের এই অকাল মৃত্যুতে আমাদের শোক জানানোর ভাষা নেই! তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে অনেক শিশু ও কিশোর 'কিশোরচিত্র' পত্রিকার মাধ্যমে সমবেদনা ও এই দুর্যোগ থেকে যেন জাপান দ্রুত পরিত্রাণ লাভ করতে পারে তার জন্য প্রার্থনা করেছে। সম্ভবত এই ধরনের ঘটনা এই দেশে প্রথম।

বিশ্বের যে কোনো দেশে প্রকৃতি কিংবা মানুষ-সৃষ্ট দুর্যোগের প্রথম শিকার হয় নারী ও শিশুপ্রজন্ম। এবারের মহাভূমিকম্পে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বহু শিশু মারা গেছে, যারা বেঁচে গেছে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে। অনেক ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকদের পরিচালনায় পাহাড়ের ওপর আশ্রয় নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছে। তবে তাদের পড়ালেখার বেশি ক্ষতি হচ্ছে। অনেকের স্কুল ভেসে চলে গেছে স্কুল চলাকালীন। আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে গেছে দু-একটি স্কুল যেমন--ইওয়াতে-জেলার উপকূলীয় স্কুল উনোসুমাই প্রাথমিক বিদ্যালয় যেখানে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৩৬১ জন।

স্কুলগুলো নতুন করে নির্মাণ করতে সময় লাগবে। এখনো শিশুরা নিরাপদ আশ্রয়ে পড়ালেখা করছে। কিন্তু তারা মোটেই ভীত নয়, নতুন করে বাঁচার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও। তাদের হাসিমুখ, চঞ্চলতা বড়দের সব দুঃখ-কষ্ট-বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করছে। চারদিকে চলছে পুরোদমে পুনর্বাসন ও পুনর্নিমাণের মহাকাজ। জাপানি জাতির আত্মিক শক্তি হচ্ছে তাদের দেশপ্রেম, কর্মপ্রেম। তাই আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন জাতিটি দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আবার উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যাদের আমরা হারিয়েছি তাদের যেন ভুলে না যাই, বিশেষ করে 'যে সকল শিশু, কিশোর ও কিশোরী প্রাণ দিয়েছে তাদের স্বপ্ন, আশা ও প্রত্যাশাকে আমরা আমাদের শ্রম ও কর্মের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িতকরতে পারি'--এই রকম ভাবছে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের শিশুরা।

ভেবে অবাক লাগে যে, কোনো অবস্থাতেই হেরে যেতে রাজি নয় জাপানি শিশুরা। তাই দেখা গেছে ভূমিকম্পের কয়েকদিন পরেই নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে ১২ বছরের একটি মেয়ে দেয়ালপত্রিকা প্রকাশ করে স্থানীয় মানুষদেরকে হতবাক করে দিয়েছে! 'দুঃখ নয়, হতাশা নয়, বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হবে' এই কথাকে সামনে রেখে সে এটা তৈরি করে। তার পত্রিকার নাম 'ফাইট' যা সারা জাপানব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। জাতীয় পত্রিকা ও টিভিতে তুলে ধরা হয়েছে তার এই কাজ। কতখানি বাস্তববাদী জাপানি শিশুরা। এরপরে তার সঙ্গে আরও কিছু ছেলেমেয়ে যোগ দিয়েছে তারা এ পর্যন্ত ৩০টির অধিক দেয়ালিকা প্রকাশ করে ক্ষতিগ্রস্তদেরকে ধ্বংসজনিত ভগ্নমনস্কতা থেকে বেরিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করছে। সাহস দিয়ে চলেছে, নিজেরাও পুনর্নিমাণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে হাসিমুখে দল বেঁধে। এই অসামান্য কাজের প্রশংসা করার ভাষাও আমাদের জানা নেই কিন্তু জাপানি শিশুদের কাছ থেকে আমাদের বাঙালি ছেলেমেয়েরা কি উৎসাহিত হতে পারে না যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজের দেশকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার জন্য?




Powerd by Manchitro Publishers, 2011 Copyright c All Rights Reserved.



সম্প্রতি তুরস্কে অনুষ্ঠিত হয় মেয়েদের  শিক্ষাগ্রহণ বিষয়ক  একটি  আন্তর্জাতিক  কর্মশালা।

তুরস্ক ইউরোপের একটি মুসলিম দেশ। প্রাচীন বাইজেনটাইন সভ্যতার স্বার বহনকারী তুরস্কের অনেক অঞ্চলেই মেয়েদের বাধ্যতামূলক  শিক্ষাক্ষেত্রে আশঙ্কাজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক   বলে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টারি কমিটিতেও আলোচিত হয়ে আসছে কয়েক বছর ধরে। যদিওবা তুরস্কে প্রাথমিক স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতিরহার এমনিতেই কম। পূর্বাঞ্চলীয়  আনাতোলিয়া প্রদেশে মেয়েদের উপস্থিতির হার আরও কম। এখানে ৯১% ছেলে এবং ৬৯ % মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়। ৪০০,০০০ মেয়ে স্কুল যাওয়া থেকে বঞ্চিত প্রধানত অর্থনৈতিক, পারিবারিক, ঐতিহ্যগত এবং ধর্মীয় কারণে।

অবশ্য তুরস্ক কত কয়েক দশক ধরে স্কুলবহির্ভূত বালিকাদেরকে স্কুলগামী করে তোলার ক্ষেত্রে  অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছিল কিন্তু  সম্প্রতি পঞ্চম ও ষষ্ঠ গ্রেডের মেয়েরা স্কুলবিযুক্ত হয়ে পড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। জুন মাসের শেষ দিকে রাজধানী ইস্তাম্বুলে UNICEF and UNESCO Institute for Statistics (UIS) এর উদ্যোগে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও অঞ্চলের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা  বৈশ্বিক পদক্ষেপ  হিসেবে দ্বিবার্ষিক  শিক্ষা প্রকল্প বিষয়ে একটি কর্মশালায় এই প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

২০০০ সালে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ Millennium Development Goals (MDG) আশা ব্যক্ত করেছিলেন যে, ২০১৫ সালের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রাথমিক স্কুলবিযুক্ত ছেলেমেয়ের সংখ্যা হ্রাস করা হবে। সেই লক্ষ্য   পূরণের    আর মাত্র ৫ বছর বাকি।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সুদানে কর্মরত ইউনিসেফ এর প্রতিনিধি নিল কাটসবার্গ মন্তব্য করেন যে, ‘বর্তমান বিশ্ব এখন যেটা চাইছে সেটা হলো, আগামী বছরগুলোতে শিক্ষাকে  মূল্যায়ন করে, তাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ভিন্ন একটি পদপে গ্রহণ করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু তাদেরকে স্কুলে নিয়ে গেলেই হবে না, আমাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে যে তারা স্কুল সমাপ্ত করে ভয়াবহ দারিদ্রকে অতিক্রম করার শিক্ষা লাভ না করলে নয়।’

২০০৭ সালের ইউআইএস এর জরিপ থেকে জানা যায় যে, বিশ্বব্যাপী ৭২ মিলিয়ন   প্রাথমিক বিদ্যালয়গামীদের মধ্যে অর্ধেকের চেয়ে বেশি মেয়েই স্কুলের বাইরে। একই সংস্থার আরও একটি জরিপ থেকে দেখা যায় যে, এই সংখ্যা ১০১ মিলিয়নে বেড়ে যায় যখন ঘরে ঘরে একটি অনুসন্ধান করা হয়। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে ২০১৫ সালের মধ্যে ৫৬ মিলিয়ন মেয়ে স্কুল আওতার বাইরে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আগামী দু বছরের জন্য গৃহীত পদপে অনুযায়ী তিনটি বিষয়ের উপর জোর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এগুলো হলো:

১] পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্যকে আরও উন্নত এবং স্কুলের উপস্থিতিকে বিশ্লেষণ করা

২] যে সকল বাধা ও ঘটনা শিশুদেরকে স্কুল বহির্ভূত করে রাখে সেগুলোকে শনাক্ত করা

৩] প্রাতিষ্ঠানিক   ক্ষমতাবৃদ্ধি  এবং বর্তমান কার্যকরী নীতিপদ্ধতিকে বিশ্লেষণ করা যাতে করে বাস্তব উন্নয়ন এবং শক্তিশালী পদ্ধতি প্রয়োগ করে স্কুলের শ্রেণীভুক্তি ও উপস্থিতির হারকে ধরে রাখা যায়

যদি এই  পদক্ষেপ  গুলো বাস্তবায়নে সম হওয়া যায় তাহলে বিশ্বব্যাপী  মেয়েদের শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন  পরিকল্পনা গ্রহণ, সংস্কার সাধন এবং নতুন করে অর্থবরাদ্দের সম্ভাবনা দেখা দেবে।

নিল কাটসবার্গ পরিশেষে বলেন, ‘এই কর্মশালায় যোগদান করতে পেরে আনন্দিত। কারণ শিক্ষা নিরাপদ, শক্তিশালী এবং  শান্তিপূর্ণ  সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। শিক্ষিত এবং স্বাস্থ্যবান শিশু    কিশোররাই তো একটি সার্বভৌম দেশ গঠন করবে--হাতিয়ার  বা অস্ত্রশস্ত্র নয়।  শিক্ষা এখন আর কল্যাণের বিষয় নয়, এটা মানবাধিকার।’





Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright c All Rights Reserved.

home
Editor : Probir Bikash Sarker
probirsrkr06@gmail.com