২০১০ সালটা আমার কাছে ছিল স্মরণীয় একটা বছর। কারণ এই বছর আমি নতুন ক্লাশে উঠেছিলাম, এই বছরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ। এই বছরে আমার বাবার ব্রেইন টিউমার অপরারেশন করা হয়েছিল আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই বছরেই আমাকে নিতে হচ্ছিল আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি।

যাহোক, আমি শুধু তখন স্কুলের ক্লাশ ও বাসায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এভাবে দেখতে দেখতে আমার প্রথম সাময়িক ও প্রি-টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। এর কয়েক সপ্তাহ পরই শুরু হয়ে গেল টেস্ট পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া যাবে না।

আমি টেস্ট পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গেই উত্তীর্ণ হলাম। তার মানে আমার সামনে শুধু একটাই পরীক্ষা, সেটা হল এসএসসি। টেস্ট পরীক্ষার তিন মাস পর অর্থাৎ টেস্ট পরীক্ষা হয়েছিল অক্টোবর মাসে এর পর ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হল আমার বহু প্রতীক্ষিত এসএসসি পরীক্ষা। তাই তখন পড়াশোনার চাপ ছিল খুব বেশি। পরীক্ষার সময় রাত জেগে পরিশ্রমের ফল পাচ্ছিলাম পরীক্ষার কক্ষে বসে। দেখতে দেখতে একসময় কিভাবে যেন একদিন আমার পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেল। দিনটি ছিল ১৩ মার্চ।

সেদিন আমার উল্লাস যেন বাঁধ ভাঙল। তাই আর দেরি না করে ১৪ তারিখেই চলে গেলাম ফরিদপুরে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে অপূর্ব এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম! এমন একটি সুন্দর স্থান বাংলাদেশে তাহলে আছে! কবির বাড়িতে প্রবেশের সময় দেখলাম ফটকে টানানো রয়েছে তাঁর কিছু কবিতা। এরপর ঢুকেই দুপাশে দুটো বাগান তারপর মূল বাড়ি। বাড়িতে মোট ঘর পাঁচটি। প্রত্যেকটা ঘরের আলমারিতে সাজানো রয়েছে কবি তাঁর পরিবারের ছবি এবং কবির পাওয়া সব পুরস্কার ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র। ছবির সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি। সব ছবি দেখা শেষ হলে পরে আলমারির জিনিসপত্রাদি দেখতে শুরু করলাম।

কবির বাড়ির সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখতে গিয়ে কখন যে দুপুর ২টা বেজে গেল টেরই পেলাম না। অথচ এসেছিলাম সকাল ১০টার সময়। এমন সময় হঠাৎ করেই একজন বিদেশীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আমার। তিনি জার্মানি দেশের নাগরিক নাম মিঃ গীরো। তাঁর কাজ হচ্ছে বাংলাদেশের কবি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা। তাঁকে পেয়ে গল্প জুড়ে দিলাম। তাঁর কাছে জার্মানির ফুটবল সম্পর্কে খোঁজখবর নিলাম, জিজ্ঞেস করলাম, হিটলার প্রসঙ্গে। তিনি যা জানতেন সবই আমাকে বললেন। বিনিময়ে আমিও তাঁকে আমার জানা কিছু তথ্য দিলাম। সে তথ্য পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন এবং আমাকে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে অনুরোধ জানালেন। এরপর আমরা দুজনে একসঙ্গে ছবি তুললাম। তাঁর সঙ্গে কথা শেষ করে গেলাম কবির বাড়ির পেছনের অংশে। সেখানে সরকারিভাবে তৈরি করা হচ্ছে একটা শিশু পার্ক। গ্রীষ্মে শিশুদের আনন্দ-বিনোদন বাড়ানোর জন্য সুইমিং পুলের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। সবকিছু দেখার পর একটা ঘরে দেখলাম একজন বৃদ্ধ মানুষ বসে আছেন। মনে হল তিনি কবি জসীম উদ্দীন এবং তাঁর পরিবার সম্পর্কে নিশ্চয়ই কিছু খবরাখবর জানবেন।

ঠিক তাই হল। জিজ্ঞেস করতেই বেশ কিছু তথ্য দিলেন যেমন একটি হল জসীম উদ্দীনের ছেলে ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। আমরা কজন সেটা জানি!

এবার ফেরার পালা। মনে মনে বললাম, এসএসসি পরীক্ষার পর এমন একটা আকর্ষণীয় জায়গায় এসে অজানা কিছু দেখা ও মজার তথ্য জানার চেয়ে আনন্দের আর কী আছে! বিশেষ করে আমাদের দেশের একজন জাতীয় কবি জসীম উদ্দীনের বাড়িটি দেখে উৎসাহ বেড়ে গেল আরও নতুন নতুন জায়গায় গিয়ে নতুন খবর সংগ্রহ করে বন্ধুদেরকে জানাবার জন্য।

 

লেখক মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি পরীক্ষা পাশ করেছে    


Powerd by Manchitro Publishers, 2011 Copyright © All Rights Reserved.



এই পৃথিবীতে শিশুদেরকে ভালোবেসে অনেক মহৎ কাজ করে গেছেন এমন মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম।

এগলাইনটাইন জেব (Eglantyne Jebb) হচ্ছেন তাঁদের মধ্যে অসামান্য মহীয়সী একজন নারী। যাঁর ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি না। তাঁর মতো শিশুদরদী মানুষই আজ বড় বেশি প্রযোজন উন্নয়নকামী দেশসমূহে। যেখানে প্রতিমুহূর্তে রাষ্ট্র ও সমাজের চরম অবহেলা আর প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে অগণিত শিশু-কিশোর। বাংলাদেশ তার অন্যতম।

এগলাইনটাইন হচ্ছেন বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত প্রথম আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সেভ দি চিলড্রেন’এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৮৭৬ সালে ইংলন্ডের শ্রপসায়ার শহরে এক ধনী এবং সংস্কৃতবান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ছয়জন ভাইবোনের মধ্যে অন্যতম এগলাইনটাইন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন লেডি মারগারেট হল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতিহাস বিষয়ে পড়ালেখা করার পর সেন্ট পিটার জুনিয়র স্কুলের শিক্ষক নির্বাচিত হন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তরুণ সমাজের বিভিন্ন সমস্যা এবং দারিদ্র সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। এরমধ্যে তিনি একদিন একটি মিশন উপলদ্ধি করেন মহান যিশুখ্রীস্টের মুখমন্ডলের দিকে তাকিয়ে।

অক্সফোর্ড শহরে কিছুদিন শিক্ষকতা করার পর তিনি কেম্ব্রিজ শহরে তাঁর অসুস্থ মায়ের সেবা করার জন্য চলে যান। সেখানে গিয়ে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান চ্যারিটি ওগনাইজেশন সোসাইটির সঙ্গে জড়িত হন। আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাদ্বারা পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি। এখানে তিনি কিছুকাল গবেষণা করে একটি গ্রন্থ লিখেন Cambridge, a Study in Social Questions নামে ১৯০৬ সালে। কিন্তু এটা খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। তিনি এরপর দীর্ঘ ছয় বছর নিরিবিলি জীবনযাপন করেন। ১৯১৩ সালে তাঁর জীবনে একটি সুযোগ আসে দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের ছোট্ট একটি দেশ মেসোডোনিয়াতে রিলিফ প্রদান কার্যক্রমে অংশগ্রহণের। প্রথম মহাযুদ্ধ শুরুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত থাকেন। তারপর যুদ্ধপূর্বলগ্নে স্বদেশে ফিরে এসে তিনি তাঁর বোন ডরোথি জেবের সঙ্গে একটি প্রকল্প হাতে নেন। তিনি ইউরোপ থেকে দৈনিক সংবাদপত্র আনার ব্যবস্থা করেন বিশেষ করে শত্রু দেশ জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পত্রপত্রিকা। বৃটেনের শত্রুপক্ষ বলে ঐসব দেশের কাগজ আনা ছিল তখন খুবই কঠিন। দুজনে মিলে একটি সাময়িকী প্রকাশ করেন ক্যাম্ব্রিজ নামে সেখানে যুদ্ধেলিপ্ত দেশগুলোর দুর্বিসহ বিপর্যস্ত সমাজজীবনের চিত্র লেখার মাধ্যমে তুলে ধরতে থাকেন। যদিও সেসব দেশের সরকার কোন রকম বিপর্যয় নেই বলে জোর প্রচার চালাচ্ছিল। কিন্তু সেসব দেশে যুদ্ধের ফলে জনজীবন যে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যহানির সংবাদ তাঁকে বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলছিল।

যুদ্ধ যখন শেষ হয় এবং জার্মান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে তখন এগলাইনটাইন ও ডরোথি চিন্তা করেন যে সেখানকার শিশুরাও নিঃসন্দেহে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শিকার যুদ্ধ এবং মিত্রবাহিনীর অবরোধ সৃষ্টি করার ফলে। যদিওবা সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে মাত্র। এই সময় ফাইট দি ফেমিন কাউন্সিল নামে একটি প্রতিষ্ঠান মিত্রশক্তির অন্যতম প্রধান সদস্য বৃটিশ সরকারকে এই অবরোধ তুলে নেবার জন্য প্ররোচিত করে। ফলে অবরোধ তুলে নেবার পর দ্রুত এগলাইনটাইন যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মান এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিয়ান শিশুদেরকে রক্ষাকল্পে রিলিফ কার্যক্রম চালু করেন।

১৯১৯ সালে ১৫ এপ্রিল ঐ কাউন্সিল সেভ দি চিলড্রেন ফান্ড নামে একটি তহবিল গঠন করে সাহায্য সংগ্রহ করার লক্ষ্যে রয়াল আলবার্ট হলে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বেশ সাড়া ফেলে এবং একটি বড় টাকার অঙ্ক সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। অবশ্য অনেকে কড়া সমালোচনাও করেছিল তাঁদের এই কর্মকান্ডকে শত্রুপক্ষের শিশুদেরকে সাহায্য করা অনুচিত, অবৈধ ইত্যাদি ইত্যাদি বলে। কিন্তু এগলাইনটাইন জেব বিরুদ্ধবাদীদেরকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করতে দ্বিধা করেননি। বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে সংঘাত বাঁধলে পরে তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও এবং মামলার আসামি হয়ে কোর্টের কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে বাধ্য হন। ৫ পাউন্ড জরিমানা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী অভিযোক্তা বা প্রসিকিউটরকে তাঁর মিশনের আদর্শ, উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত করে ৫ পাউন্ড চাঁদা আদায় করে নেন। এইভাবে ক্রমে ক্রমে বিরুদ্ধবাদীদের সমালোচনাকে  ভ্রুক্ষেপ না করে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশগুলোতে স্বেচ্ছাসেবী কর্মীদেরকে পাঠাতে থাকেন। আরও সাহায্যের জন্য সংস্থাটি বৃটিশ নাগরিকদেরকে আহবান জানান। দিনে দিনে তহবিল স্ফীত হতে থাকে, বিস্তৃত হয় কর্মকান্ড। 

এই সাফল্য দুবোনকে আলাদাভাবে দুস্থ শিশু-কিশোর প্রজন্মকে রক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাঁরা গঠন করেন International Save the Children Union সুইটজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ১৯২০ সালে বৃটিশ সেভ দি চিলড্রেন ফান্ড এবং সুইটজারল্যান্ডের রাড্ডা বারনেন তথা সুইটজারল্যান্ডের সেভ দি চিলড্রেন ফান্ডের যৌথ উদ্যোগে। লন্ডনে এই ইউনিয়নের প্রতিনিধি যুক্ত হন এগলাইনটাইন জেব। তিনি সংস্থার তহবিল বৃদ্ধির জন্য পেশাদারী প্রচার চালাতে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিতে ম্যানেজার নিযুক্ত করেন। তাছাড়া পূর্বে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ছিল সেটাকেও তিনি এবার কাজে লাগান। নবনিযুক্ত ম্যানেজার লেউইস গোল্ডেন বাণিজ্যিক বুদ্ধি খাটিয়ে সংবাদপত্রের পাতায় পূর্ণপৃষ্ঠা বিজ্ঞান দিয়ে প্রচুর অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। অর্থাৎ পেশাদারিত্বকে এগলাইনটাইন প্রাধান্য দিতে থাকেন।

ক্রমশ মধ্য ইউরোপে ধীরে ধীরে জনজীবনের উন্নতি ঘটলেও এরপর দেখা দিল গ্রীস এবং তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোতে শরণার্থী সমস্যা,সংঘাত,দুর্ভিক্ষ।সেখানে রিলিফ পাঠিয়ে সাহায্য করে তাঁর প্রতিষ্ঠান বৃটিশ সেভ দি ডিলড্রেন এবং দারিদ্রবস্থা একসময় নিয়ন্ত্রণে আসে। এই ঘটনার পর পর ১৯২১ সালে রাশিয়াতে আশানুরূপ ফলন না হওয়াতে সেখানেও দুর্ভিক্ষ মাথা চাড়া দেয়। ফলে সেখানেও তাঁর সংস্থা হাত বাড়িয়ে দেয়। 

রাশিয়াতে দু বছর কাজ করার পর যখন তহবিলে অর্থের সঙ্কট দেখা দেয় তখন তিনি নতুন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।জেনেভাতে গিয়ে ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করে শিশু অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক একটি প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানান। কিভাবে সেটা কাজ করবে তারও একটি পরিকল্পনা তিনি লিখিত আকারে উপস্থাপন করেন এবং পরে আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছেও তুলে ধরেন। Declaration of the Rights of the Child বা Declaration of Geneva নামে পরিচিত মাত্র পাঁচটি বক্তব্যসম্বলিত এই প্রকল্পটি অতিশীঘ্রই লীগ অব নেশন নামক আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক গৃহীত হয় পরের বছর ১৯২৪ সালে। এটা ছিল তাঁর এই পর্যন্ত কর্মকান্ডের মধ্যে একটি বড় বিজয়। মানুষের ইচ্ছেশক্তি যদি আন্তরিক এবং প্রবল হয় তাহলে সেটা বৃথা যায় না এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

১৯২৫ সালে জেনেভাতে প্রথম আন্তর্জাতিক শিশুকল্যাণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এগলাইনটাইন লিখিত শিশু অধিকার বিষয়ক প্রস্তাবটি ব্যাপক আলোচনা ও আলোড়নের সৃষ্টি করে। বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট সমাজসেবী, শান্তিবাদী সংস্থা এবং সরকারি প্রতিনিধিরা জোরালোভাবে সমর্থন দেয়। ১৯৫৯ সালে এই প্রস্তাবের বিবরণকে আর সম্প্রসারিত করে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে আরও দুটি মতামত সংযুক্ত করা হয়। এই ধারাক্রমে ১৯৮৯ সালে Convention on the Rights of the Child নামক যে ঐতিহাসিক শিশু অধিকার সংরক্ষণ নীতিমালা ঘোষিত হয় সর্বসম্মতিক্রমে তার মূল ভিত্তিই ছিল শিশুকল্যাণময়ী এগলাইনটাইন জেব এর ঐ শিশু অধিকার সংরক্ষণ প্রস্তাবটি।

বেশ কয়েক বছর তিনি গলগন্ড অসুখে ভুগে ১৯২৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এগলাইনটাইন জেব পৃথিবীতে সশরীরে না থাকলেও তাঁর স্বপ্ন ও কর্মকান্ড আজ বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে ৯০ বছর অতিক্রান্ত করেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেভ দি চিলড্রেন আজ বিশ্বের বহু দেশে নিরলস কাজ কাজ করে চলেছে। লন্ডনের কেম্ব্রিজ শহরে অবস্থিত এর প্রধান দপ্তর। বিভিন্ন ধনী দেশে রয়েছে একাধিক শাখা কার্যক্রম। যেমন সেভ দি চিলড্রেন ইউএসএ কাজ করছে বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে। ১৯১৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বুকে সংঘটিত সব প্রাকৃতিক ও মানুষসৃষ্ট দুর্যোগে সাহায্য ছাড়াও সেভ দি চিলড্রেন বিপুল সংখ্যক অসহায়, দুস্থ, দুর্ভাগ্যপীড়িত শিশু-কিশোরকে সাহায্য ও পুনর্বাসন করেছে, এখনো সংস্থার এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এগলাইনটাইন জেব সংস্থাটিকে এমন ভাবে পেশাদারিত্বের আর্দশে গড়ে দিয়েছেন যে সেখানে নেই কোন কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, রাজনীতি, অর্থলিপ্সা এবং পক্ষপাতিত্ব। এই সংগঠনটিকে বিশ্বের বহু বিখ্যাত ব্যক্তি সমর্থন দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধীও অন্যতম।

মহান সমাজ সংস্কারক এগলাইনটাইন জেব শৈশবকালেই ছিলেন সাহসী এবং ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দস্যিপনা,দৌড়ঝাঁপ এবং খেলাধুলা করেছেন। ফলে শিশুকালেই ঋজু মানসিকতা দিয়ে তিনি সমাজের বাস্তবতা গভীরভাবে উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন। তারই প্রতিফলন ঘটেছে তার অকুতোভয় কর্মকান্ডে। একাধিক বাধাবিপত্তি এলেও থোরাই গ্রাহ্য করেছেন সেসব। বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাবে ক্ষমতালোভী, অর্থলোভী এক শ্রেণীর মানুষের কাজসাজিই যে বারংবার যুদ্ধ সংঘটিত করে পৃথিবীতে এবং অহেতুক আবালবৃদ্ধবনিতাকে অমানুষিক দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দেয় সেটা তিনি খুব ভালো করেই উপলদ্ধি করেছিলেন। তাঁর দুটি মন্তব্য থেকেই প্রতিভাত হয় যে তিনি কী চরিত্রের একজন মানুষ ছিলেন: All wars, just or unjust, are waged against the child (সকল যুদ্ধ, সঠিক অথবা বেঠিক, শিশুদের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়), The human race has an obligation to protect its weaker members (মানবজাতির দায়দায়িত্ব আছে তার দুর্বল সহযোগীদেরকে রক্ষার)।  


Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.

home
Editor : Probir Bikash Sarker
probirsrkr06@gmail.com