কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন--

দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য

লহ এ নগর

 

কবিগুরুর এ আর্তি আজ সবার মনে বাজছে। কেননা, অবাধে বৃক্ষনিধনের ফলে পরিবেশে যে দূষণ ঘটেছে তার ফলশ্রুতিতে দেখা দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী ক্রমশ হয়ে ওঠছে উষ্ণ। ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এতে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশসহ অনেক সমুদ্র তীরবর্তী দেশ হুমকির সম্মুখীন। পরিবেশ দূষণের কারণে পৃথিবী নামক গ্রহটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পরিবেশ দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী পিটার ওয়ালিসটন বলেছেন, এনভায়রনমেন্ট পলিউশন ইজ এ গ্রেট থ্রেট টু দা এগজিসটেন্স অফ লিভিং বিইং অন দ্যা আর্থ।  পরিবেশের এরূপ বিরূপ মনোভাবের মুখে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বিশ্বব্যাপী ৫ জুন পালিত হল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এবারকার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ফরেস্ট অ্যাট ইয়োর সার্ভিস। অর্থাৎ আপনার সেবায় বন ও প্রকৃতি। পরিবেশ সংরক্ষণে প্রকৃতি ও বনের ভূমিকা সম্পর্কে সকলকে সচেতন করা এবং বৃক্ষরোপনে উৎসাহিত করাই ছিল এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের মূল উদ্দেশ্য। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন--

 

মরিতে চাহিনা আমি এ সুন্দর ভুবনে

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই।

 

মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বৃক্ষের তুলনা নেই। বৃক্ষ না থাকলে পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হত। এই বিবেচনায়, অহেতুক বৃক্ষনিধন মানুষের কাজ নয়। কিন্তু বাস্তবে মানুষ ও প্রকৃতির সংঘাত মানবসভ্যতার জন্য বিরাট হুমকিস্বরূপ এক মহাবিপর্যয়। তাই পরিবেশ দূষণ রোধে এখনই সঠিক ও দূরদর্শী ভবিষ্যত কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ এবং সঠিক বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। চিরকিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো দৃঢ়চিত্তে বলতে হবে--

 

চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,

এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

দ্বাদশ শ্রেণী, বিভাগ: বিজ্ঞান

মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান আইডিয়াল কলেজ, টাঙ্গাইল


Powerd by Manchitro Publishers, 2011 Copyright © All Rights Reserved.



কিনগিয়ো বা goldfish জাপানের গ্রীষ্মঋতুর অন্যতম প্রতীক। এই সময় লাল, কমলা, সাদা যেমন আছে তেমনি নানারঙে মিশ্রিত কিনগিয়ো পরিলক্ষিত হয় সর্বত্র। ছোট ছোট এই মাছগুলো দিয়ে শিশু-কিশোর এমনকি বড়রা পর্যন্ত খেলেন। এই ঐতিহ্যবাহী খেলাকে বলে কিনগিয়ো সুকোই তাইকাই বা National Championship of Scooping Goldfish,এর সূচনা হয়েছে ১৯৯৫ সালে মূলত মধ্যযুগের এদো শাসনামল (১৬০৩-১৮৬৮) থেকে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে চলে আসার ফলে। এই খেলায় ১৫ বছর বয়স্ক ছেলেমেয়েরা ছাড়াও বড়রা অংশগ্রহণ করতে পারেন। খেলাটি হচ্ছে: পাতলা কাগজের থলি দিয়ে তৈরি গোলাকার প্লাস্টিকের হাতা যাকে বলে পোই এর সাহায্যে তিন মিনিটের মধ্যে কতগুলো কিনগিয়ো তুলে নিয়ে একটি পাত্রে রাখা যায়। থলিটি ছিঁড়ে যাওয়ার আগেই মাছ তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করা হলেও পিছলে যাওয়া মাছ তোলা অত সহজ হয় না। তবুও ৬০টির ওপর মাছ তোলার ঘটনাও ঘটে। যে যত বেশি মাছ তুলতে পারে তত বেশি পয়েন্ট অর্জন করে, এভাবে সংখ্যার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ পয়েন্ট যে পায় সেই হয় সে বছরের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন। প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এই খেলা।

এই খেলাটি  প্রথম প্রচলিত হয় নারা-জেলার ইয়ামাতো কোরিয়ামা শহরে। সামুরাই যোদ্ধা ইয়ানাগিসাওয়া ইয়োশিসাতো (১৬৮৭-১৭৪৫) পোষ্যপ্রাণী হিসেবে এই মাছ চীন দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলেন বলে কথিত আছে। তারপর এখানেই বংশবৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ক্রমে কিনগিয়ো প্রজনন ব্যবসা গড়ে ওঠে এবং আইচি-জেলা হয়ে এদো তথা রাজধানী টোকিওতে বিস্তৃতি লাভ করে মেইজি যুগে (১৮৬৮-১৯১২)। শোওয়া যুগের (১৯২৬-৮৯) প্রারম্ভে টোকিওতে কমপক্ষে ২০টি কিনগিয়ো প্রজননকেন্দ্র তথা কিনগিয়ো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল, ক্রমে ক্রমে তা বিলুপ্ত হয়ে এখন দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া নেই। এর কারণ মূলত শিশুজন্মহ্রাস এবং অন্যান্য আরও নতুন খেলার আগমন।

অবশ্য এই খেলা ছাড়াও ছেলেমেয়েরা বাসায় অ্যাকুয়ারিয়ামে রেখে খাবার দিয়ে প্রতিপালন করে এই মাছ। স্বচ্ছজলের ভিতরে কিনগিয়ো যে সারাক্ষণ নড়াচড়া করে বেড়ায় এই দৃশ্যই তাদের কাছে দারুণ উপভোগ্য। সবার ঘরেই যে অ্যাকুরিয়াম আছে তা নয়, অধিকাংশ ছেলেমেয়েই সাময়িক সময়ের জন্য দোকানে বিক্রিত ছোট প্লাস্টিক নির্মিত জলাধার কিনে এনে লালনপালন করে। আবার অনেকেই সাধারণ পাত্রাদিতে জল ঢেলে সেগুলোকে নিয়ে খেলে। অবশ্য গ্রীষ্মে যে কিনগিয়ো নিয়ে ছেলেমেয়েরা মেতে ওঠে তা নয়, জারিগানি বা এক ধরনের মোটা লাল চিংড়ি, সাধারণ চিংড়ি, মেদাকা মাছ, কচ্ছপের বাচ্চা দিয়েও খেলাধুলা করে দল বেঁধে। নদী-নালা, খাল-হ্রদে এই সময় এইসব জলক্রিড়ার ধুম পড়ে যায়। পড়শি দিয়ে দিয়ে মাছ ধরা তো হয়ই জালি দিয়ে এগুলোকে ধরে প্লাস্টিকের জলবাক্সে ভরে রেখে নিবিষ্ট মনে সাঁতারকাটা লক্ষ করে আনন্দ পায় তারা। 

তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে এই রঙিন কিনগিয়ো। নানা আকৃতির এই মাছগুলো দেখতে সত্যি অপূর্ব। বাহারি লেজ নাড়িয়ে যখন ঘুরে বেড়ায় চমৎকার লাগে দেখতে। এননিচি বা গ্রীষ্মকালীন যে কোন উৎসব উপলক্ষে কিনগিয়ো ব্যবসায়ীরা দোকান দিয়ে বসেন। আর অমনি ছেলেমেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিচিত্র রঙের কিনগিয়োভর্তি পাত্রের ওপর। একটি মাছের দাম কমপক্ষে ১০০ ইয়েন। জলাধারে রাখা মাছের ঝাঁক থেকে জালি দিয়ে নিজেদের পছন্দানুযায়ী মাছ ছেঁকে তুলে নেয় তারা। তারপর দোকানি একটি জলভর্তি ছিদ্রওলা পলিথিনের থলিতে সেটিকে পুরে দেয়। ছেলেমেয়েরা সেই থলি হাতে নিয়ে বাসায় ফিরে। অবশ্য হেমন্ত ঋতু এলে পরে যাদের বাসায় স্থায়ী অ্যাকুয়ারিয়াম নেই তারা সেগুলোকে নদী-নালাতে ছেড়ে দেয়। গ্রীষ্মের আগেই কিনগিয়ো ব্যবসায়ীরা পোনা থেকে মাছগুলোকে খাইয়ে বড় করে।

গ্রীষ্মে যখন এই কিনগিয়ো সবুজ আচ্ছাদিত স্বচ্ছ অগভীর খাল ও জলাশয়ে নড়েচড়ে বেড়ায় তখন প্রকৃতি অপরূপ এক রূপ ধারণ করে। সেই রূপ দেখার জন্য যে কোন পথিক দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য।

জাপানে সাধারণত যে কয় প্রকারের কিনগিয়ো পাওয়া যায় সেগুলো হলো: রানচু এটি হচ্ছে কিনগিয়োর রাজা এরপর কিয়ারিকো, তোকাইনিশিকি, সাকুরানিশিকি, হামাআকানে, ওয়াকিন, তানচো উল্লেখযোগ্য। কিনগিয়োর আদি জন্মস্থান চীন বলে কথিত আছে। তৃতীয় শতাব্দীর দিকে হঠাৎ প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে এক ধরনের মাছ এই কিনগিয়োতে রূপান্তরিত হয় বলে জানা যায়।

এই কিনগিয়ো ছোট একটি মাছ হলে কি হবে, ১৯৯৪ সালে স্পেস শার্টলে চড়ে মহাকাশ পাড়ি দিয়েছে। মহাকাশ ভ্রমোৎপাদক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় এই মাছে তা পরীক্ষা করার জন্য জাপানি মহাকাশচারী চিআকি মুকাই নিয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গে করে। পরীক্ষায় দেখা গেছে কিনগিয়ো এবং মানুষের কানের ভিতরে অনুভূত প্রতিক্রিয়া একইরকম। অর্থাৎ মানুষের কানের গঠনপ্রণালী যেমন কিনগিয়োরও তাই।



Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.

home
Editor : Probir Bikash Sarker
probirsrkr06@gmail.com