প্রাচীনকাল থেকেই সময়কে ধারাবাহিকভাবে ধরে রেখেছে গুহাচিত্র, অক্ষর, ভাষা, প্রত্ননিদর্শন, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র এবং জাদুঘর। এসবের মধ্যে হাজার হাজার বছরের সময় ধরা আছে। এগুলো না থাকলে মানবসভ্যতার কিছুই আমরা জানতাম না। জানতাম না আঞ্চলিক ও বিশ্বইতিহাস। সময়ের সঙ্গে ইতিহাস ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। সময় এবং ইতিহাস তাই একে অপরের পরিপূরক। সুতরাং সে ইতিহাস জানে না তার সময় সম্পর্কে কোন ধারণা নেই।

সময় মানবজীবনে এক অপরিহার্য গুণনীয়ক বা ইংরেজিতে যাকে বলে factor,সময়ের উপর সবকিছু নির্ভর করে। যে কোন কাজ বা প্রকল্প শুরু ও শেষ করার জন্য একটি নির্ধারিত সময়কে বেছে নেয়া হয়। সময় না হওয়া পর্যন্ত কোনকিছুকেই জোরজবরদস্তি করে সম্পূর্ণ করা যায় না,গেলেও তা পরিপূর্ণ হয় না নানা রকম গলদ থেকে যায়। থেকে যায় ভুল-ভ্রান্তি। একটি ভুল হাজার ভুলের জন্ম দেয়। এই ভুল ক্রমাগত সময় ও সমাজকে প্রভাবিত করে মানবজীবনে নানা ধরনের বিড়ম্বনা, দুর্দশা, ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে। সৃষ্টি হয় অশান্তি। এই জন্যই সময়কে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হয়।

সময় এবং স্রোত কখনোই কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তাই সময়মতো করণীয় কাজ শেষ করে ফেলা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু সেটা আমরা করতে পারি না অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও। যে কারণে আমরা পিছিয়ে পড়ি। একবার পিছিয়ে গেলে যে সময়টা নষ্ট হয় সেটাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। ফলে কাজের দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়। এক সময় আমরা হতাশ হয়েও পড়ি। কাজেই সময়জ্ঞানকে সকলেই যদি বুঝতে চেষ্টা করি তাহলে সার্বিক উন্নয়নের পথে আমরা এগিয়ে যেতে পারি।

আর এই যে উন্নয়ন তার সঙ্গে সময়ের এবং ইতিহাসের সম্পর্ক অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আলাদা করার উপায় নেই। উন্নয়ন, উন্নতি বলতে শুধু অগ্রগতি, প্রগতি, বিকাশ বা আধুনিকাতাকে বোঝায় না, পরিবর্তন ও বিবর্তনকেও বোঝায়। পরিবর্তন বা বিবর্তন কিংবা ক্রমবিকাশ আধুনিকতার সম্পূরক। ঘটনার ক্রমবিকাশের ধারাপথেই উন্নতি ঘটে। উন্নতি ঘটতে হবে একইসঙ্গে সমান্তরালভাবে মানসিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে। এর জন্য চাই শিক্ষা তৃণমূল পর্যায় থেকে। শিক্ষা পর্যায় আবার বিবিধ যেমন প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক, পারিবারিক এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আবার শিক্ষা অগাধ বিষয়ভিত্তিক। শিক্ষার মূলভিত্তি প্রথমত তাত্ত্বিক ইংরেজিতে যাকে বলে theoretic অর্থাৎ বাস্তবিক বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক নয়; দ্বিতীয়ত ব্যবহারিক, প্রায়োগিক অর্থাৎ practical এবং তৃতীয়ত আধ্যাত্মিক বা প্রকৃতিপ্রভাবিত চেতনাবোধ ইংরেজিতে যাকে বলে religious..

বর্তমান বিশ্বে এখন প্রধানত দুটি ভিত্তিই দৃশ্যমান একটি তাত্ত্বিক অর্থাৎ তত্ত্বগত অন্যটি ব্যবহারিক। অবশ্য তত্ত্ব বা ধারণাকে বাস্তবে রূপদান করাটাই বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের ব্যবহারিক রূপই হচ্ছে প্রযুক্তি। এই যে উন্নয়নের ক্রমবিকাশ তার পেছনে রয়েছে কোন না কোনভাবে প্রাপ্ত শিক্ষা--সেই শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানাহরণ এবং জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সমন্বয় পদ্ধতি। কাজেই আমরা বলতে পারি এই বিশ্বব্রহ্মান্ড একটি সমন্বয় পদ্ধতির আধার বা মেশিন আরও সহজ করে বললে বলতে হয় ম্যাকানিজম। এই ম্যাকানিজমকে জানতে হলে আমাদের প্রতিনিয়ত সময়ের ক্রমবিকাশকে অনুসরণ করতে হবে। এখন যে সময়টা চলে গেছে তাকে আমরা কোথায় পাবো? সবই কি বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে, শিক্ষকের মুখে নাকি পাঠ্যপুস্তকে আছে?

না,নেই। থাকা সম্ভবও নয়। কেননা সেখানে সময় এবং পরিসরের সীমাবদ্ধতা আছে। আর্থিক সঙ্গতির প্রসঙ্গও বিদ্যমান। তাই আমাদেরকে যেতে হবে সময়কে ধরে রেখেছে যে ইতিহাসের উপাদান তার কাছে। ইতিহাসের উপাদান কোথায় আছে? জাদুঘরে। জাদুঘর সভ্যতার নিদর্শন। বলা হয়ে থাকে যে,যে দেশে জাদুঘর বেশি এবং সমৃদ্ধশালী সে দেশের নাগরিক তথা জাতি তত বেশি সভ্য। কেন সভ্য?সভ্য মানুষ শৈশব থেকেই সময়জ্ঞান রাখে বলে।

জাদুঘরে সময়ের তিনটি স্তর এবং দিকনির্দেশনা আছে। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। তাই ইতিহাস ও জাদুঘরকে বলা হয়ে থাকে ভবিষ্যতের আয়না। সেখানে প্রতিফলিত হয় কী? সময়।

তাই সময় এত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের মূল্য যে বোঝে না প্রকৃতপক্ষে সে নিজেকেই বোঝে না। নিজেকে আমরা বুঝতে পারি না বলেই কাউকে বুঝতে চাই না। সময়জ্ঞান নেই বলেই বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রই আজ অনগ্রসর, দুর্নীতিগ্রস্ত, কলুষিত, বিপর্যস্ত। বিশেষ করে রাজনীতি ও সরকার। এই দুই স্তরে যারা আছে তারা যে সময়জ্ঞান রাখে না এটা সুস্পষ্ট। সময়জ্ঞান নেই বলেই যথাসময়ের কাজ যথাসময়ে করার আগ্রহ নেই। সময়জ্ঞান নেই বলেই কাজের সমন্বয় নেই। সময়জ্ঞান নেই বলেই বিলম্বিতকৃত ভালো কাজেরও সুপ্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় না। সময়জ্ঞান নেই বলেই ধৈর্যশীলতা গড়ে ওঠে না। ধৈর্যশীলতা নেই বলেই পরমত,পরসহিষ্ণুতা, পরহিতৈষণা নেই। যে কারণে বাঙালির রাজনীতি সংহত, সুসংগঠিত, গণতান্ত্রিক নয়।

একটি উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন জাতি গড়ে তোলার জন্য যে কতিপয় গতিশীল,সংবেদনশীল, দূরদর্শী এবং মানবমঙ্গলকামী নেতৃবৃন্দের প্রয়োজন অনস্বীকার্য সেই সময়োপযোগী নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ সৃষ্টি করতে পারেনি স্বাধীনতার পর আজ পর্যন্ত। বরং অকালেই কিছু সংখ্যক রাষ্ট্রীয় নায়ককে ১৯৭৫ সালেই জাতি হারিয়েছে। এরপরে লাগাতার সামরিক শাসন এবং আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্যবর্জিত ব্যক্তিবিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত যে মূল্যবান সময়টাকে জলাঞ্জলি দিয়েছে সজ্ঞানেই বাংলাদেশের ভূখন্ডে এবং এর ফলে যে জাতিগত চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে তার প্রতিফলনই আজকের বেপরোয়া তরুণ প্রজন্ম, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদী ধবংসাত্মক কার্যকলাপ। এই নিয়ন্ত্রণহীন আত্মধবংসী প্রবণতা সময়েরই অভিশাপ। সময়কে সময়মতো পাঠ না করার ফল আরও কত সময় ধরে চলবে কে বলবে?।

জাতির নিরপরাধ, নিষ্পাপ, স্বপ্নচারী শিশু-কিশোর প্রজন্মের কথা চিন্তা করার মানুষ আজ কোথায়? আজ জননী তার গর্ভেধারণ করা সন্তানকে হত্যা করে সামান্য কারণে, অধৈর্যশীল গাড়িচালক চাপা দিয়ে চলে যায় বিদার্থী শিশুকে, অভাবের তাড়নায় মা সন্তানকে বিক্রি করে দেয় অর্থের বিনিময়ে, মা শিশুসন্তানকে বিষয় পান করায় নিজহাতে ব্যক্তিস্বার্থে, সহপাঠী কিশোর নির্দ্বিধায় হত্যা করে বন্ধুকে, বিপথগামী কিশোরের উৎপাতে কিশোরীরা অকাতরে আত্মহত্যা করে,ছাত্রদের হাতে আজ কলমের বদলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র--এই সব চলমান বিরূপ চালচিত্র সেই হারানো মূল্যবান সময়েরই শিকার মাত্র। যার সূচনা করেছে লাগামহীন রাজনীতি। তারপরও রাজনীতিকদের শিক্ষা হয় না যে, বর্তমান সময়টাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনা করার! হায় কবে যে, রাষ্ট্রবিধাতাদের সময়জ্ঞান হবে কে বলে দেবে?

 

তার প্রতীক্ষায় আমরা আছি। 




Powerd by Manchitro Publishers, 2010 Copyright © All Rights Reserved.

home
Editor : Probir Bikash Sarker
probirsrkr06@gmail.com