আমার বয়স সাত বছর। বাড়ির সবার ছোট। সবাই আমাকে অনেক আদর করে। কাল পহেলা বৈশাখ। সকালে ঘুম থেকে ওঠে জানালা পাশে বসে বাইরের আলো দেখছিলাম। একটু একটু আলো ফুটছে, বাতাসও বইছে। ভাবছি আজ পহেলা বৈশাখ। সারাদিন যা যা করব, সারা বছর তাই তাই করব। সকালেই একটি নতুন একটা জামা পড়ব। সারা দিন হাসি খুশি থাকব। এসব ভাবছি। কারণ আমি ভাবতে ভালোবাসি।

অনেকণ পর মা উঠলেন সঙ্গে বাবাও। আমি বাবাকে বললাম, আজ মেলায় নিয়ে যেতে হবে। বাবা বললেন, তোমার ভাইয়া নিয়ে যাবে। তখন মনে হল রাতে ভাইয়ার শেখানো কথা। ভাইয়া বলেছিল, আমি যেন বাবাকে মেলায় নিয়ে যেতে বলি। ভাইয়ার কথা মনে পড়তেই আমি বললাম, না, তোমার সাথে মেলায় যাব। বাবা বললেন, আমার সময় কোথায়? আর এমনিতেই আমি কান্না শুরু করে দিলাম। বাবা বললেন, আচ্ছা নিয়ে যাব, বললাম তো নিয়ে যাব। তিনি আরো বললেন, আজ তো মেলা না। তখন আবার কান্না শুরু করলাম। বললেন, আচ্ছা নিয়ে যাব তো। মেলাতো কাল, আজ না। আমি বললাম, তাহলে কালই যাব।

সারাদিন আমার আনন্দে কেটে গেল। পরের দিন বাবা আমাকে মেলায় নিয়ে গেল। মেলায় অনেক ভিড় ছিল। আমি নাগরদোলায় চড়েছি, নাচ দেখেছি। যে ছেলেমেয়েরা নাচছিল তারা খুব সুন্দর সেজেছিল। বাবা আমাকে মাটির পুতুল, বেলুন, তাল পাতার বাঁশি, মাটির হাঁড়ি, পাতিল এবং কিছু চুড়ি কিনে দিল। আর বাড়ির জন্য কিছু খাবার কিনল। এই আমার বাবার সাথে মেলায় যাওয়া। তারপর আমি আর বাবার সাথে মেলায় যাইনি। বাবা খুব ব্যস্ত মানুষ। প্রতি বছর ভাইয়ার সাথে মেলায় যাই। এ বছর ভাইয়া আসেনি। ভাইয়া ঢাকায় থাকে। সে নাকি এ বছর বন্ধুদের সাথে মেলায় যাবে। ঢাকায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবে। এ বছর আর মেলায় যাওয়া হয়নি। পরের বছরও ভাইয়া আসেনি। সে বছরও মেলায় যাইনি।

পরের বছর। আমি জানালার পাশে বসে ভাবছি এ বছরও তো ভাইয়া আসবে না। এ বছরও মেলায় যাওয়া হবে না। আরো ভাবছি, ছোটবেলার মেলায় যাওয়ার কথা। কী আনন্দ থাকত মনে! এখন সব আনন্দ যেন আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে হয় বাবার কথা। কতদিন তার সাথে মেলায় যাই না। এবার বাবার সাথে মেলায় যাব। এ কথা ভেবে মনে আনন্দ ভরে গেল। এমন সময় মা আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আমি মাকে বললাম, পহেলা বৈশাখ কবে? বলল, এইতো আর দুই দিন আছে। আমি বললাম, ভাইয়া আসবে না? মা বলল, না আসবে না। রাতে বাবাকে বললাম, আমাকে মেলায় নিয়ে যেতে হবে। বাবা বলে, দ্যাখো দেখি মেয়ের কথা? আমার কি মেলায় যাওয়ার সময় আছে। বললাম, আমি জানি না। আমাকে নিয়ে যেতেই হবে। নইলে কিন্তু আমি সেই ছোটবেলার মতো আবার কেঁদে দেব। বাবা বলল, তোমার ভাইয়ার সাথে যেও। আমি বললাম, ভাইয়া আসবে না। বাবা বলল, কিন্তু আমার তো সময় নেই। আমি আবারও বললাম, আমি জানি না। আমি দুই বছর ধরে মেলায় যাই না। আর তোমার সাথে কবে মেলায় গিয়েছিলাম প্রায় ৬ বছর আগে। আমি তোমার সাথে মেলায় যাব। অনেক কষ্টে বাবাকে রাজি করালাম।

পহেলা বৈশাখের দিন বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘুরেছি। কিন্তু মেলায় যাইনি। কারণ আমি বাবার সাথে মেলায় যেতে চেয়েছিলাম। সন্ধ্যায় বাবা চলে যাচ্ছিল। আমি বললাম, আমি যাব তো তোমার সাথে, দাঁড়াও। তারপর বাবার সাথে মেলায় যাই। মনে হচ্ছে ছোটবেলায় দেখা মেলা আর এখন দেখা মেলা অনেক পাল্টে গেছে। বাবা আমাকে সেই ছোটবেলার মতো বেলুন কিনে দিতে চাইল। আমি বললাম, বাবা আমি তোমার আর সেই ছোট্ট মেয়েটি নই। আমি বড় হয়ে গেছি। বাবা বলল, আরে! সত্যিইতো। আমার মেয়ে বড় হয়ে গেছে। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।

বাবা আমাকে বলল, কি কিনব? আমি বললাম, ফুলের টব কিনব। বাবা আমাকে দুটো ফুলের টব কিনে দিল। আমি গল্পের বই পড়তে ভালোবাসি। তাই বাবা আমাকে দুটি বইও কিনে দিল। একটা ছিল নজরুল ইসলামের, অন্যটা ছিল সুফিয়া কামালের। বাবা আমাকে কিছু চুড়িও কিনে দিল। তাও আবার কাঁচের চুড়ি। আমরা অনেকণ মেলায় ঘুরলাম। নাচ, গান দেখলাম। মনে হয়েছে ছোটবেলায় দেখা নাচ, গান এখন আলাদা। তারপর বাবা বাড়ির জন্য কিছু খাবারের জিনিস নিল, খই, মুড়ি, মুড়কি, তিল্লাই, মঠ ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর আমরা রিক্সা করে বাড়ি ফিরে আসি। বাবা বাড়িতে এসে মাকে বলছিল, আমার সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ কত বড় হয়ে গেছে। সেই কথা বলা, চলাফেরা সব কিছুই বদলে গেছে।

আসলে মা-বাবার কাছে সন্তানরা সবসময় ছোটই থাকে। কখনই বড় হয় না।

 

অষ্টম শ্রেণী, আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

Powerd by Manchitro Publishers, 2011 Copyright © All Rights Reserved.
home
Editor : Probir Bikash Sarker
probirsrkr06@gmail.com