
গত এক দশকে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে
জাপান বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধন করেছে। সম্ভবত জার্মানির পর এশিয়ার জাপানই পরিবেশরক্ষা
এবং ইকোলজিকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের সর্বত্র নাগরিক সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে
তোলার ক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ সফল। প্রতি পরিবার, কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে অফিস-আদালত,
দোকানপাট, হাট-বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা এমন কোন স্থান নেই যেখানে পুরনো,
পরিত্যক্ত পণ্যসামগ্রী মূল্যবান সম্পদ (রিসোর্স) হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। কাজেই
সবকিছু রিসাইক্লিং বাক্সে জমা করে রাখা হয় এবং সময়মতো পৌরকর্তৃপক্ষের কর্মীরা এসে তুলে
নিয়ে যায়। কেন্দ্রিয় সরকার, নগর, আঞ্চলিক প্রশাসন এবং শত শত এনজিও, এনপিও আর নাগরিক
সংগঠন-সংস্থা-সমিতি সর্বত্রই শিশু থেকে বয়স্ক নাগরিককে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ক্যাম্পেন,
সেমিনার, মেলা-উৎসব, ওয়ার্কসপের আয়োজন করে সচেতন করে তুলছে কীভাবে, কোথায় আবর্জনা ফেলতে
হবে যাতে করে রিসাইক্লিং-এ তা ব্যবহার করা যায়। গত দেড় দশক ধরে শহর-বন্দর-গ্রাম-পর্বত-নদী-নালা-খাল-উদ্যান-মাঠ
আমূল বদলে যাচ্ছে মূলত প্রকৃতি ও পরিবেশকে পুনরুদ্ধার করার ফলে। উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে জাপান জুড়ে অভূতপূর্ব শিল্পায়ন
ও নগরায়ণ ঘটেছে যার ফলশ্রুতিতে ব্যাপকভাবে দূষিত হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ।
কাটা হয়েছে পাহাড়, উজাড় হয়েছে বনাঞ্চল, নদনদী হারিয়েছে তার স্বচ্ছ জলের প্রবাহ। কলকারখানার
বিপুল পরিমাণ তেজষ্ক্রিয় ও রাসায়নিক বর্জ্যে ভরে উঠেছিল শহরের নদীগুলো। ষাটের দশকে
উদ্ভূত কারখানার তেজষ্ক্রিয় বর্জ্যজনিত ‘মিনামাতা’রোগ জাপান ও বিশ্বকে হতবাক্ করে দিয়েছিল। এখনো ভুগছেন
অনেক জাপানি নাগরিক দূরারোগ্য ক্যান্সার, স্নায়ুবিক দুবর্লতা, পক্ষাঘাত প্রভৃতি রোগে।
কিন্তু দুদশক আগেই জাপান ঘুরে দাঁড়িয়েছে
জার্মানিকে অনুসরণ করে। কোথাও এখন আর দূষিত পরিবেশ পরিলক্ষিত হয় না। জাতিগতভাবেই জাপানিরা
প্রকৃতিপূজারী ও সৌন্দর্যপ্রিয়। ফলে সাময়িকভাবে সেই ঐতিহ্যকে হারিয়ে ফেলেছিলেন তারা,
এখন পুরনো ও আধুনিকতার সমন্বয়ে সমগ্র জাপানকে একুশ শতকের আলোকে সাজাতে ব্যস্ত সবাই।
যে কারণে সারা বছর জুড়েই অনুষ্ঠিত হচ্ছে এখানে-সেখানে ইকোলজি বা বাস্তববিদ্যার প্রদর্শনী।
সেখানে নাগরিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা থেকে শুরু করে সরকারি, বেসরকারি পণ্য প্রস্তুতকারী
ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিবেশ এবং ইকোলজিকেন্দ্রিক গবেষণাকৃত কত রকম নতুন নতুন
পণ্যসরঞ্জাম, পরিশোধন পদার্থ, যন্ত্রপাতি উপস্থাপিত করছে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ না করলে
বাস্তবিকই বিশ্বাস করা কঠিন! বলতে দ্বিধা নেই যে, জাপান উন্নয়নশীল দেশগুলোর মডেল বিশেষ
করে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে।‘জলবায়ু-উদ্বাস্তু’হওয়ার আগেই বাংলাদেশ এই বিষয়ে বিস্ত্র শিক্ষা ও সাহায্য
গ্রহণ করতে পারে জাপান থেকে বলে অভিজ্ঞমহলের বিশ্বাস। তারই প্রমাণ পাওয়া গেল গত ৫-৬ জুন, শনি-রবিবার
টোকিওর ইয়োয়োগি কোয়েন জাতীয় উদ্যানে অনুষ্ঠিত ৪র্থ ইকোলাইফ ফেয়ার ২০১০-এ। জনৈক তরুণী
কর্মী জানালেন ১৯৯০ সাল থেকে এই উৎসবের সূচনা হয়ে ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করছে। চারটি জোনে বিভক্ত করা হয়েছে মেলাকে যেমন
এনপিও-এনজিও, কোম্পানি ও সংস্থা-সমিতি, পরিবেশ
মন্ত্রণালয়, পানীয়-খাদ্য এবং শিশু-কিশোর জোন। সর্বমোট ৩৪টি এনপিও-এনজিও, ২৪টি কোম্পানি
ও সংস্থা-সমিতি, ১১টি পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংস্থা, ৬টি পানীয়-খাদ্য এবং শিশুদের ৩টি বড়
সাংস্কৃতিক আয়োজন। টোকিও এফএম সানডে স্পেশাল আয়োজনে মেলাকে তুলে ধরতে গিয়ে জাপান সরকারের
পরিবেশমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার প্রচার করে। দুদিনে মোট ১৩টি ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয় পরিবেশ
সমস্যা ও উত্তরণ পন্থা বিষয়ে। মেলার প্রধান উদ্যোক্ত হল জাপান সরকারের
পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং রাজধানী টোকিও মহানগর প্রশাসন। আর সার্বিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা
করেছে: শিক্ষা ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়, অর্থ ও শিল্প মন্ত্রণালয়, ভূমি ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়,
শিবুইয়া-ওয়ার্ড শিক্ষা পরিষদ, জাপান সংবাদপত্র সমিতি, জাপান বেসরকারি সম্প্রচার ইউনিয়ন,
জাপান ডিপার্টমেন্টাল স্টোর্স ইউনিয়ন, জাপান চেনস্টোরস ইউনিয়ন, জাপান জীবননির্বাহ সমবায়
ইউনিয়ন, টোকিও জীবন-জীবিকা সমবায় ইউনিয়ন, কেয়োও রেলওয়ে কোম্পানি, গ্রীন বায়ারস নেটওয়ার্ক
সংস্থা, টোকিও এফএম এবং মিউজিক ট্রি সংগঠন।
মেলায় ছিল সর্বমোট ৭৮টি বুথ এবং কোনটার
চেয়ে কোনটা কম আকর্ষণীয় ছিল না। দিনব্যাপী মানুষের ভিড় লেগেছিল প্রতিটি স্টলে। প্রাকৃতিক
সম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশ বিজ্ঞান, পানি-বায়ু, খনিজসম্পদ, জ্বালানী, কার্বন অফসেট হ্রাস,
খাদ্য, সৌর ও বিদ্যুৎশক্তি, রিসাইক্লিং প্রভৃতি বিষয় এই মেলায় প্রাধান্য পেয়েছে। এর
মধ্যে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল গবেষণাধীন পানিবিশুদ্ধকরণ মেশিন, আগামী দিনের জ্বালানী,
কাঠ দিয়ে পছন্দসই চপস্টিক তৈরি,কাঠের তৈরি পরিবেশবান্ধব ফার্ণিচার তৈরি, নিজগৃহে সৌর-প্যানেল
তৈরি, সরবরাহকৃত জলকে পানীয় হিসেবে ব্যবহার, কাগজের মিল্ক-প্যাকেট রিসাইক্লিং পদ্ধতি,
বৃষ্টির পানি পরিমাপ করার মিটারযন্ত্র, রেভেন্ডা ফুল দিয়ে বিশুদ্ধ আতর তৈরি, সৌর ও
বিদ্যুৎশক্তির সাহায্যে পরিরেশবান্ধব রাজপথ ও সড়ক নির্মাণ, তকি তথা ইবিস বকপাখির আবাসন
তৈরি, পাল সিস্টেমস দ্বারা তৈরি বায়োফুড এবং দই, বৈদ্যুৎচালিত গাড়ির কারিগরি, সাতোইয়ামা
বা ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সৌন্দর্য সংরক্ষণ প্রকল্প, ইন্দোনেশিয়া বারিবনের জীবজন্তু সংরক্ষণ
ইত্যাদি প্রদর্শনী। প্রায় প্রতিটি স্টলেই ছিল সহজ কুইজের আয়োজন ফলে শিশুদের পাশাপাশি
বড়রাও কুইজের উত্তর লিখে নানা রকম ব্যবহারিক জিনিসপত্র উপহার অর্জন করেছেন। জাপানের
বিখ্যাত মাসিক সাময়িকী ‘প্রেসিডেন্ট’আয়োজন করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যভিত্তিক একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী তাতে
প্রচুর সমাগম ঘটে। আগামী দিনের জীবন-জীবিকা কিভাবে পরিবর্তিত
হবে পরিবেশ সচেতনতার মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য আগত অধিকাংশ পরিদর্শকই ছিল
তরুণ এবং শিশু-কিশোর। এবং কর্তৃপক্ষের এটাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য যে, এখনকার তরুণ প্রজন্ম
যদি পরিবেশ সম্পর্কে সুস্থচিন্তা এবং সচেতন হয় তাহলে বয়স্কসমাজকে তারা সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান
করতে পারবে। আগামী প্রজন্মে যে সকল শিশু জন্মলাভ করবে তারা শৈশব থেকেই সুপরিবেশ এবং
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে বসবাস করার সৌভাগবান প্রকৃতিনির্ভর আধুনিক নাগরিক হবে।
মেলা চলাকালীন একাধিক ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত
হয় বিভিন্ন স্টল এবং মঞ্চে। সেখানে পরিবেশ-গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীরা
বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে আগত দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন জাপান ভূখন্ড
এবং ভৌগলিকভাবে সম্পর্কিত বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে জলবায়ুর অশুভ পরিবর্তন, ভূউষ্ণায়ণ
তথা গ্রীনহাউস গ্যাস, কার্বনডাই অক্সাইড গ্যাস কী বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং
এই সমূহ বিপর্যয় থেকে মানবজাতিকে উদ্ধারকল্পে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থাসমূহ কিভাবে
কাজ করছেন এবং পৃথিবীর নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই কি কি ভূমিকা পালন না করলে নয় ইত্যাদি
বিষয়ে অবহিত করেন, দর্শকদের প্রশ্ন-কৌত‚হলের সম্ভাব্য উত্তর প্রদান করেন। এই ওয়ার্কশপে বিখ্যাত জাপানি প্রকৃতিবিদ
হিরোশি সাসাকিও উপস্থিত ছিলেন। দুদিনই মঞ্চে ছিল সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত
উঠতি পপস্টার, শিশু-কিশোরদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পরিবেশ সংক্রান্ত অ্যানিমেশন
চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। মিউজিক ট্রি সংগঠনের শিল্পীরা মাতিয়ে রাখেন মঞ্চ। পাশাপাশি ছিল
খাদ্যজোনে রকমারি দেশি-বিদেশি মুখরোচক খাবারের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাবারের সমাবেশ। মেলায়
আগত দর্শকরা সেসব খাবার আনন্দের সঙ্গেই উপভোগ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত
এই মেলায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ছিল গ্রীন ইলেকট্রিসিটি যা মূলত সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে আহরিত।
প্রতিবছরের মতো এবারও বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার ছিল।
![]() Editor : Probir Bikash Sarker probirsrkr06@gmail.com ![]() |